বিশ্ব বাঘ দিবস আজ,বাঘ কমছে সুন্দরবনে

এই লেখাটি 70 বার পঠিত

বিশ্ব বাঘ দিবস আজ, কমছে বাঘ সুন্দরবনে
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন যুগ যুগ বাংলাদেশের উপকূল রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। অথচ এই বন যেমন উজার করা হচ্ছে, তেমনি হত্যা করা হচ্ছে এর অলংকার বাঘকে। ১৭ বছরে অন্তত ৩২টি বাঘকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৩ জানুযায়ী বাগেরহাটে একটি বাঘ হত্যা করা হয়। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বাঘের ভেতরের চরিত্রটিকে তার মতো থাকতে দিতে পারলে মানুষের সঙ্গে বাঘের সংঘাত হবে না। তাতে বাঘেরও বদনাম হবে না মানুষখেকো হিসেবে আবার মানুষেরও বদনাম হবে না বাঘ হত্যাকারী হিসেবে। বাঘ না বাঁচলে শুধু বন নয়, ওই এলাকার মানুষও অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। কারণ বাঘ কমলে, বন ধ্বংসের প্রবণতাও বাড়বে।’ এদিকে জানুয়ারিতে শুরু হওয়া বাঘশুমারি মে মাসে শেষ হলেও এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি শুমারির ফল। ২০১৫ সালে সরকারের করা জরিপে ১০৬টি বাঘের মধ্যে বর্তমানে তার সংখ্যা কমেছে না বেড়েছে, তা জানা যাচ্ছে না। ২০০৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৪০টি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন বাঘের সংখ্যা বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশে তা ক্রমান্বয়ে কমছে। বাঘ রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রতিবছর ২৯ জুলাই ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ পালিত হয়। তারপরও দেশে এই প্রাণীর সংখ্যা কমছে। গত বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের দুটি ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফসলের কীটনাশক দিয়ে সুন্দরবনের বাঘ মারা হচ্ছে। বাঘ মারতে ফুরাডন নামের কীটনাশক ব্যবহার করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। হরিণ মেরে তাতে ফুরাডন মাখিয়ে বনের মধ্যে টোপ হিসেবে রেখে দেয়া হয়। বাঘ ওই বিষ মাখানো হরিণ খেয়ে বিষক্রিয়ায় মারা যায়।’
এদিকে হত্যা করা বাঘ কীভাবে অন্যত্র পাচার হয়, সে সম্পর্কে গবেষণা করেছে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল। ২০১৬ সালের জুনে তারা বাঘ হত্যা ও চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকারের কাছে জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকার ৩২ জন রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বাঘ হত্যায় মদদ দেয়া ও চোরাচালানে জড়িত।
‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ উপলক্ষে শনিবার সঙ্গে কথা বলেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি জানান, ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া বাঘশুমারি শেষ হয়েছে। দ্রুতই এর ফল প্রকাশ করা হবে। আমার বিশ্বাস, বাঘের সংখ্যা বাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘বাঘ বাঁচলে বন বাঁচবে, রক্ষা হবে সুন্দরবন। সুন্দরবন তথা বাঘসহ জীববৈচিত্র রক্ষায় সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। আমাদের গর্ব, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বাড়াতে ‘বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করা হয়েছে। প্ল্যান অনুযায়ী ২০১৮ সাল থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।’ মন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব বাঘ দিবসে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানোসহ একাধিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এ প্রাণী রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। চোরাকারবারি কেউ রক্ষা পাবে না।’

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মদিনুল আহসান যুগান্তরকে জানান, দিবসটি উপলক্ষে রোববার খুলনা শহরে র‌্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনারসহ নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যানের মোড়ক উন্মোচন করা হবে। তিনি বলেন, ‘বাঘশুমারির মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরি করতে সময় প্রয়োজন।’

২০১০ সালে টাইগার সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩টি বাঘসমৃদ্ধ দেশের সরকারপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। ওই সামিটে মূল বিষয় ছিল আগামী ২০২২ সালে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার। প্রতিটি দেশেকে বাঘ সংরক্ষণে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নসহ ১৬টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করছে দেশগুলো।

বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের (ডব্লিউডব্লিউএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ বছরে ভারত, নেপাল ও রাশিয়ায় বাঘের সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশে তা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সুন্দরবনের আয়তন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে হরিণ ও শূকরের মতো বাঘের শিকার প্রাণী নিশ্চিত করা গেলে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান বলেন, ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী সুন্দরবনে মাত্র ১০৬টি বাঘ আছে। শিকারিদের কবলে পড়ে বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এরই মধ্যে কম্বোডিয়া থেকে বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। চীন ও ভিয়েতনামে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি বাঘ রয়েছে। বাঘ হত্যা ও চোরাচালান বন্ধ করতে না পারলে বাংলাদেশেও বাঘ বিলুপ্ত হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশান প্ল্যানে ২০২৭ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার কৌশল নেয়া হয়েছে। এদিকে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান যুগান্তরকে জানান, বাঘ চোরাকারবারিদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। মানুষ সচেতন হলে বাঘ হত্যা ও চোরাচালান বন্ধ হয়ে যাবে। এ লক্ষ্যে র‌্যাব দিনরাত কাজ করছে।

Aviation News