মালয়েশিয়া গমনে রয়েছে সুখবর

এই লেখাটি 26 বার পঠিত

মালয়েশিয়ায় কর্মী গমনের ক্ষেত্রে জিটুজি প্লাস পদ্ধতি অনুসরণ করে মাত্র এক বছরেই দারুণ সাফল্য পেয়েছে সরকার। বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারের তালিকায় এক নম্বরে থাকা সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানি যখন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) যখন হাতছাড়া হয়ে পড়ছে, তখন মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণে দেশের এই সাফল্য অর্থনীতির জন্যও এক ধরনের সুবাতাসই বটে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১২৭৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সেটি ১৪৯৭ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বলা বাহুল্য, জিটুজি প্লাস প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় প্রায় পৌনে দুই লাখ কর্মী গমনের কারণেই রেমিট্যান্স এত বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারি তথ্য-উপাত্ত বলছে, প্রবাসে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জিটুজি প্রক্রিয়ার ধীরগতিতে এ দেশের কর্মসন্ধানী যুবসমাজ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছিল। জিটুজি প্লাস প্রক্রিয়ায় এ হতাশা থেকে মুক্তি আসে। বেশ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার পর অনলাইনে শতভাগ স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ যাত্রা। ২০১৭ সালের ১০ মার্চ জিটুজি প্লাস প্রক্রিয়া মেনে ৯৭ কর্মী কার্গো লোডার হিসেবে মালয়েশিয়া যান। সেই থেকে শুরু। এখনো এ শুভযাত্রা চলছে অব্যাহতভাবে। জিটুজি পদ্ধতিতে ৪ বছরে ১৪ লাখ নিবন্ধিত কর্মীর বিপরীতে মালয়েশিয়ায় গেছেন মাত্র ৭ হাজার কর্মী। আর জিটুজি প্লাস প্রক্রিয়ায় এক বছরে গেছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ২১৩ কর্মী।

জিটুজি প্লাস পদ্ধতি প্রসঙ্গে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি জানান, এটি শতভাগ তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি। আধুনিক এ প্রক্রিয়ায় একটি তথ্যের সঙ্গে অন্যটির সমন্বয় না হলে অনলাইনে তা সাপোর্ট করবে না। তাই প্রতারণার সুযোগ নেই বলা যায়। এ ছাড়া কর্মীরা তাদের কাজের নিরাপত্তা, বীমা সুবিধাসহ সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

অনলাইন প্রক্রিয়ার সুবিধা

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতির জিটুজি প্লাসের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হচ্ছে মালয়েশিয়ায়। এক্ষেত্রে একজন কর্মীর বায়োমেট্রিক পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর অনলাইনে ভিসা প্রসেসের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। আগের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একজন কর্মীর নিয়োগে তিন মাস থেকে ৯ মাস লাগলেও নতুন এ পদ্ধতিতে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। মালয়েশিয়ার সরকারের তালিকাভুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিনারফ্লাক্স ও বেস্টিনেট এ পদ্ধতিতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে মালয়েশিয়া সরকার সে দেশের ৫টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে। বেস্টিনেট, সিনারফ্ল্যাক্স ছাড়া বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছেÑ ইউকেএসবি, এস-ফাইভ ও বায়োটেক।

সিনারফ্লাক্স ও বেস্টিনেটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে কিছু কারিগরি জটিলতা সৃষ্টি হলেও এখন এসবের উত্তরণ ঘটেছে, কোনো সমস্যা নেই। কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে মোট ১২টি ধাপ অনুসরণ করা হয়। এসব ধাপের কোনো একটি যদি অসম্পূর্ণ থাকে, তা হলে অনলাইন ফরম্যাট তা সাপোর্ট করবে না। অনলাইন প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি বা অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। তারা আরও জানান, সরলতা বা অজ্ঞতার কারণে তৃতীয় পক্ষের খপ্পরে পড়ে কেউ যেন অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় না করেন, এ জন্য যথেষ্ট প্রচারও চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে কতটি প্রতিষ্ঠান কর্মী পাঠাবে, সেটি তাদের দেখার বিষয় নয়। তা দেখবে দুই দেশের সরকার।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, অতীতের কর্মকা- যাচাই করে ৭৪২টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম মালয়েশীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়। এসব এজেন্সি থেকে দেশটির সরকার ফের যাচাই-বাছাই করে যোগ্যতার ভিত্তিতে ১০টি কোম্পানির নাম চূড়ান্ত করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে কর্মী পাঠাচ্ছে।

মালয়েশিয়া সরকারের প্রতিনিধিরা জানান, অনলাইন প্রক্রিয়ার প্রথমে দেশটির যে প্রতিষ্ঠানে কর্মী প্রয়োজন, সে প্রতিষ্ঠান অনলাইনে সরকারের কাছে চাহিদাপত্রসহ আবেদন করে। এর বিপরীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা ও সক্ষমতা যাচাই করে রিপোর্ট দেয়। চাহিদাপত্র যথার্থ প্রতীয়মান হলে মালয়েশীয় সরকার কর্মী নেওয়ার অনুমোদন দেয়। শুধু বাংলাদেশ থেকেই নয়, একই পদ্ধতি অনুসরণ করে অন্য ১৫টি উৎস দেশ থেকেও কর্মী নিচ্ছে মালয়েশিয়া।

এদিকে বাংলাদেশ সরকার অভিবাসন ব্যয় ৩৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিলেও অভিযোগ রয়েছেÑ কোনো কোনো এজেন্সি এ সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে জটিলতা এড়াতে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। জানা গেছে, বায়রার এ প্রস্তাব সরকারের বিবেচনাধীন।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ার সরকার প্রথম তিন বছরের ভিসা দিচ্ছে। পরে এক বছর করে নবায়ন করে মোট ৫ বছর মালয়েশিয়ায় কাজ করা যাবে। ভিসা নবায়ন ফি মালিকপক্ষ বহন করবে। মালিকপক্ষ চাইলে কর্মীরা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কর্মীদের শতভাগ বীমা নিশ্চিত করা হচ্ছে। আগে একজন কর্মীর মৃত্যু হলে কিংবা আহত হলে তিনি বা তার স্বজন কোনো সুযোগ-সুবিধা পেতেন না। এখন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮০ হাজার চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো বৈধ শ্রমিকের অপেক্ষায় আছে। কেলাং প্রদেশে চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিওনার্ড লুসের সঙ্গে আমাদের সময়ের কথা হয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে। তিনি তার কোম্পানিতে বাংলাদেশি কর্মী নিতে হাইকমিশনের সহায়তা চান। বলেন, আমার কোম্পানির ৭০ শতাংশ কর্মীই বাংলাদেশি। এখনো আমার কোম্পানিতে অনেক কর্মী প্রয়োজন। বাংলাদেশ থেকে এসব কর্মী আনার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হাইকমিশনে এসেছি।

মালয়েশিয়ায় যখন বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, তখন শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। চিহ্নিত একটি স্বার্থান্বেষী মহল, যাদের অতি মুনাফাখেকো মনোভাবের কারণে সৌদি আরব, ইউএইর শ্রমবাজার হুমকিতে পড়েছে, সেই মহলটি সম্প্রতি অপপ্রচার চালাচ্ছেÑ মালয়েশিয়ায় জিটুজি প্লাস পদ্ধতি বাতিল হয়ে গেছে বলে। অথচ এ পদ্ধতিতে কর্মীগমন অব্যাহত আছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, চলতি মাসে দুই দেশের যৌথ কার্যকরী গ্রুপের সভা করতে মালয়েশিয়াকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। জিটুজি প্লাসের ৭০ হাজার চাহিদাপত্র সত্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

জানা গেছে, চলমান প্রক্রিয়া বাতিল করা নিয়ে সম্প্রতি মন্তব্য করেন মালয়েশীয় সরকারের নতুন মানবসম্পদমন্ত্রী। এতে করে এক ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। যদিও মন্ত্রীর ওই মন্তব্যের পর প্রায় ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও মালয়েশীয় সরকারের কোনো নেতিবাচক পদক্ষেপের তথ্য পায়নি ঢাকার প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার নেতারা মনে করেন, মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন সরকার সার্বিক প্রক্রিয়াটি তদন্তের পর দেশটিতে কর্মী পাঠানোর সুযোগ আবারও উন্মুক্ত করে দিতে পারে।

Aviation News