অস্বাভাবিক হ্যান্ডলিং চার্জে কার্গোর বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ বিমান

এই লেখাটি 1103 বার পঠিত
IMG_25112019_090318_(728_x_410_pixel)

অস্বাভাবিক হ্যান্ডলিং চার্জে কার্গোর বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ বিমান।

কার্গোর বাজার হারাচ্ছে বিমান। নিম্নমুখী হচ্ছে বিমানের কার্গো বাণিজ্য। অস্বাভাবিক হ্যান্ডলিং ও বেবিচক চার্জ আদায়ের পরও দ্রুত সেবা নিশ্চিত না হওয়ায় কার্গো চলে যাচ্ছে কলকাতা ও কলম্বো রুটে। এ বিষয়ে মূলত কোন ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় সঙ্কুচিত হয়ে আসছে শুধু বিমানের কার্গো পরিধি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিবর্তে বিকল্প রুটে দেশের বাইরে কার্গো পাঠাচ্ছে রফতানিকারকরা। এতে কমছে বিমানের ব্যবসা। বর্তমান বিশ্বের তুলনায় বিমানের কার্গোতে প্রতি কেজিতে ১ ডলার বেশি আদায় করা হচ্ছে চার্জ। এতে বার বার রফতানিকারকরা বিমান ও বেবিচকের কাছে হ্যান্ডলিং ও সিকিউরিটি চার্জ কমানোর প্রস্তাব দেয়ার পরও কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। রফতানিকারকরা বাধ্য হয়েই শুধু খরচ ও সময় বাঁচাতে বিকল্প পথে কার্গো পাঠাচ্ছেন দেশের বাইরে। অথচ আকাশ পথে কার্গোর পরিধি বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। প্রতি বছর গড়ে কমপক্ষে ২০ শতাংশ হারে কার্গোর ভলিয়ম বাড়ছে। এমিরেটস, লুফথানসা, টার্কি, ক্যাথে প্যাসিফিক, চায়না ইস্টার্ন, হংকং এয়ার, কাতার, কুয়েত, ইতিহাদ ও ব্যাঙ্কক এয়ারের কার্গো ফ্লাইটগুলো রীতিমতো প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে ঢাকা থেকে আকাশ পথে পণ্য পরিবহনে। বিমানের নিজস্ব কার্গো উড়োজাহাজ সার্ভিস না থাকায় বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলো এই রমরমা বাণিজ্য করছে। তারপরও বিমান নিজস্ব উড়োজাহাজ দিয়ে যাত্রীর পাশাপাশি কার্গোও বহন করছে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।

জানতে চাইলে বিমান সচিব মহিবুল হক বলেন, আমরা চার্জ কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি। যেভাবে বলা হচ্ছে-কার্গো কমছে সেটা ঠিক নয়। কিছু রফতানিকারক দ্রুত মালমাল পাঠানোর জন্য ঢাকার পাশাপাশি কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন।

রফতানিকারকদের অভিযোগ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হাউসে গেলে প্রচুর সমস্যা চোখে পড়ে। স্থানাভাবের দরুন লোড-আনলোডে সময় লাগা, বিমানের কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ ও সিভিল এভিয়েশনের সিকিউরিটি ও অন্যান্য চার্জ এত বেশি যে, তা বিশ্বের সর্বদ্বিতীয়। অথচ এই কার্গো কলকাতা দিয়ে পাঠানো হলে খরচ কমে আসে কেজি প্রতি এক থেকে দেড় ডলার।

মনির নামের এক ভুক্তভোগী জানান, সম্প্রতি তিনি যুক্তরাজ্যে গার্মেন্টের একটি চালান সমুদ্রপথে সঠিক সময়ে পাঠাতে ব্যর্থ হয়ে দ্রুত বিমানবন্দরের কার্গো দিয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, কার্গো দিয়ে এই ৫ হাজার কেজি পোশাক পণ্য পাঠাতে যে ব্যয় তার অর্ধেক খরচে কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে পাঠানো সম্ভব। শেষে তিনি সড়ক পথেই কলকাতা পাঠানোর পর সেখান থেকে আবার আকাশ পথে এই চালান পাঠান। এতে ঢাকার তুলনায় কেজি প্রতি ৩০ সেন্টস (২৫ টাকা) কম পড়ে। সময়ও কম লাগে গড়ে প্রতি ফ্লাইটে ৫ ঘণ্টা। শুধু মনির নন, তার মতো অন্যরাও একই পথ ব্যবহারে রফতানি পণ্য পাঠাচ্ছেন ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে। বিমান জানিয়েছে গত বছর কার্গো হাউসে আর-এ ৩ এরিয়ার স্থানসঙ্কুলান না হওয়ায় ভারতের ওই নতুন রুট ব্যবহারের বিশেষ অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর থেকেই রফতানিকারকরা ঢাকার পরিবর্তে কলকাতা ও কলম্বো রুটের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বিমানের হিসাব অনুযায়ী- প্রায় ২ লাখ বর্গফুটের রফতানি কার্গো হাউসে আরএ-৩ এরিয়ায় (ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানের বিশেষ নিরাপদ এলাকা) মাত্র ৪১ হাজার বর্গফুট বিশেষ বেষ্টনীতে। আমদানি কার্গোতেও মাত্র দেড় লাখ বর্গফুটের স্পেস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। সীমিত এলাকায় এত বিশাল পরিমাণের কার্গো হ্যান্ডল করাটা খুবই কষ্টসাধ্য। এত সীমাবদ্ধতার মাঝে বিমান চলতি অর্থবছরে শুধু কার্গো শাখার রাজস্ব আদায় করেছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। বিমানের ডেডিক্যাটেড কার্গো ফ্লাইট না থাকলেও শুধু নিজস্ব উড়োজাহাজ দিয়ে চলতি বছর প্রায় ৩০ হাজার টন কার্গো বহন করেছে।

এ সম্পর্কে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ড এ্যাসোসিয়েশন্স পরিচালক বখতিয়ার জানান, সাধারণত ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কার্গো ফ্লাইটে কেজি প্রতি ২ থেকে সোয়া ২ ডলার লাগে। এ ছাড়া আরও দিতে হয়- বিমানের হ্যান্ডলিং চার্জ বাবদ ৮ সেন্ট ও সিভিল এভিয়েশনের বিভিন্ন সিকিউরিটি চার্জ বাবদ কেজি প্রতি ৬ সেন্টস। সেই আরও ৬ সেন্টস লাগে স্পীড মানি ও অন্যান্য চার্জবাবদ। অথচ কলকাতা বিমানবন্দরে টার্মিনাল হ্যান্ডলিং ও সিকিউরিটি চার্জ বাবদ মোট লাগে মাত্র ৪ সেন্টস। সে তুলনায় বলা চলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ব্যয় বিশ্বের সর্বোচ্চ দ্বিতীয় ব্যয়বহুল। এ দিক থেকে হিসেব করলে ঢাকার পরিবর্তে কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে কার্গো পাঠালে মোট ব্যয়ের ২৫ ভাগ সাশ্রয় হয়।

বিমান জানিয়েছে, হযরত শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি ও রফতানি কার্গো হাউস দিয়ে বছরে তিন লক্ষাধিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করে। শুধু চলতি অর্থবছরেই ৩ লাখ ৬০ হাজার ১৭১ টন কার্গো সেবা দিয়েছে বিমান। কার্গোর এই উর্ধমুখী প্রবণতা থাকলেও অবকাঠামোগত ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ছে না। বিশেষ করে রফতানি কার্গো হাউসের শেড এতই ছোট যে প্রায়ই সময়মতো দ্রুত কার্গো সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। প্রায়ই শেডের বাইরে খোলা আকাশের নিচে মালামাল রাখতে হয়। এতে চুরি ও হারানোর ঘটনা ঘটছে অনায়াসে।

বাংলাদেশ এয়ার ফ্রেইট ফরোয়ার্ড এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম বলেন, ঢাকা থেকে কলকাতা ও কলম্বো হয়ে নতুন এই রুটে প্রতিমাসে কমপক্ষে গড়ে ২৫ শত টন গার্মেন্টস পণ্য রফতানি পাঠানো হয়। এটা পিক সিজনে আরও বাড়ে। এখানকার কার্গোতে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার দরুন বাধ্য হয়েই নতুন রুটের দিকে ঝুকছে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা। বিমানের উচিত জরুরী ভিত্তিতে কার্গোর অবকাঠামোগত ও অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো। তিনি জানান, তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এক্সপো ফ্রেইট লিমিটেড এককভাবে দেশের গার্মেন্টস পণ্য আকাশপথে রফতানি করছে। দৈনিক যেখানে শাহজালাল বিমানবন্দরের দিয়ে ৫শ’ টন কার্গো রফতানি করা হচ্ছে- সেখানে তার প্রতিষ্ঠান এককভাবেই কলকাতা রুট দিয়ে দৈনিক ৫০ টন কার্গো বহন করছে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকার পরিবর্তে কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে কার্গো রফতানিতে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব। যেমন ঢাকা থেকে কেজি প্রতি ২ ডলার ২০ সেন্টস চার্জ লাগে। একই মাল কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে পাঠালে খরচ হয় মাত্র দেড় ডলার।

জনকন্ঠ

Aviation News