বন্যায় আক্রান্ত ৭ জেলা

এই লেখাটি 26 বার পঠিত

বন্যায় আক্রান্ত ৭ জেলা
দেশের ৭ জেলায় মাঝারি আকারের বন্যা চলছে। দেশে ও ভারতের পূর্বাঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে নেমে আসা পানি এ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এ বন্যা ১০ দিন স্থায়ী হতে পারে। পরে বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়তে পারে টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জসহ দেশের মধ্যাঞ্চলে।
চলতি মৌসুমে আগস্টের মধ্যে এ ধরনের আরও দু’একটি বন্যা হতে পারে বলে বন্যা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, সিলেটের পর উত্তরাঞ্চলেও বন্যা চলছে। এ মুহূর্তে সিলেট, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া এবং কুড়িগ্রামের কিছু অংশে বন্যা চলছে। পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরাসহ ভারতের পূর্বাঞ্চলে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের উত্তর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও কিছুদিন ধরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণেই এ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।
আরিফুজ্জামান জানান, যখন কোনো বন্যা ১৫ দিনের বেশি স্থায়ী হয় তখন সেটাকে ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর কম স্থায়ী হলে সেটাকে আমরা মাঝারি ধরনের বন্যা বলি। এখন যে বন্যা চলছে সেটা ৭-১০ দিন স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এফএফডব্লিউসি’র তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় এ বন্যা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরীর পানি ৭টি স্থানে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা চলছে।
তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি বেড়েই চলেছে। এ কারণে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার নিুাঞ্চল ইতিমধ্যে প্লাবিত হয়ে গেছে।
এফএফডব্লিউসি’র এক বুলেটিনে দেখা যায়, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি যে হারে বাড়ছে তাতে মঙ্গলবার নাগাদ বিভিন্ন স্থানে পানি বিপদসীমা স্পর্শ করবে। যমুনার পানি শনিবার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ছিল ১৯ দশমিক শূন্য ৬ সেন্টিমিটার। ওই পয়েন্টে ১৯ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার পানি পৌঁছলে তাকে বিপজ্জনক লেবেল ধরা হয়। এ পয়েন্টে ১০ জুলাই নাগাদ বিপজ্জনক লেবেলে পানি পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
একইভাবে সারিয়াকান্দিতে আজকেই পানি বিপদসীমা পার হতে পারে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে গতকালই পানি বিপদসীমা পার হয়েছে। একই অবস্থা সিরাজগঞ্জ সদরে। উজান থেকে নেমে আসা পানি রাজবাড়ীর আরিচায় বিপদসীমায় ১৬ জুলাই পৌঁছতে পারে। মূলত ১৬ জুলাই থেকেই মধ্যাঞ্চলে বন্যার পানির ধাক্কা লাগার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি সংস্থা এফএফডব্লিউসি আরও বলছে, গঙ্গা-পদ্মা বেসিনেও পানির স্তর বাড়ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা ধরে পানি বৃদ্ধির এ হার অব্যাহত থাকবে। অপরদিকে আপার মেঘনা অববাহিকা ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি অববাহিকার প্রধান নদীগুলোতে পানি স্তর হ্রাস পাচ্ছে।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশি-বিদেশি আবহাওয়া ও বন্যাসংক্রান্ত পূর্বাভাস সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে অতিবৃষ্টি থেকে মাঝারি আকারের বন্যা সতর্কতা জারি করেছে। তবে আশঙ্কার দিক হচ্ছে, বন্যার সঙ্গে নদী ভাঙন বেড়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, গত তিন বছর ধরেই বন্যার কবলে পড়ছি আমরা। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বন্যার এ প্রাদুর্ভাবের সম্পর্ক আছে।
সুনামগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজার : টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি হওয়া দুই লক্ষাধিক মানুষ শনিবার সকাল থেকে সূর্যের দেখা পেয়ে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারিভাবে বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়নি। ফলে খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বানভাসি মানুষ। বন্যায় গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢোকায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। ছাতক-দোয়ারা, ছাতক-সুনামগঞ্জ, ছাতক-জাউয়া সড়কের বিভিন্ন অংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবেদা আফসারি জানান, বন্যার সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে পৌঁছে দেয়া হবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মানিক চন্দ্র দাস জানান, ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। যেসব বিদ্যালয়ে বন্যার পানি ঢুকেছে সেখানে পাঠদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে দোয়ারাবাজারে বৃষ্টি না হওয়ায় মেঘালয় ঘেঁষা বগুলাবাজার, বাংলাবাজার, নরসিংপুর ও লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। বিভিন্ন স্থানে সড়কে ভাঙন ও ফাটল দেখা দিয়েছে। সড়কে পানি থাকায় উপজেলা সদরের সঙ্গে বগুলা, লক্ষ্মীপুর, লিয়াকতগঞ্জ, বাংলাবাজার, হকনগর, বালিউরা, নরসিংপুর ও নাছিমপুর এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : শাহজাদপুর উপজেলার রাউতারায় নবনির্মিত রিং বাঁধটি শনিবার সকাল ও দুপুরে দু’দফায় দু’স্থানে কেটে দিয়েছে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও নৌকা চালকরা। ফলে শাহজাদপুর উপজেলার পশ্চিম এলাকার ৩টি ইউনিয়নসহ চলনবিল অঞ্চলের ৮ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ ও গো-বাথান। ফলে কৃষকরা তাদের গবাদিপশু বাড়িতে নিয়ে রেখেছেন।
কাঁচা ঘাসের মাঠ ডুবে যাওয়ায় গো-খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ২-৩শ’ টাকা বেড়েছে। ফলে এ অঞ্চলের গো-খামার মালিক ও কৃষকরা গবাদিপশুর খাদ্য নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এ বাঁধ কেটে দেয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় দেড় কোটি টাকা জলে গেছে।
প্রতি বছরই এলাকার মৎস্যজীবী ও নৌকা চালকরা তাদের সুবিধার জন্য এ বাঁধ কেটে দেয়। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মচারী নিুমানের বাঁধ তৈরি করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করে যাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে পোতাজিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বেপারী বলেন, কৃষকরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ নিুমানের বালু দিয়ে তৈরি লো-হাইড রিং বাঁধ নির্মাণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ।
দেওয়ানগঞ্জ : পাহাড়ি ঢলে দেওয়ানগঞ্জের নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শনিবার বিকালে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা ডাংধরা ইউনিয়নের পাথরের চরে ভারতের মেঘালয়ের একটি শিশুর লাশ ঢলের পানিতে ভেসে আসে। শুক্রবার বিকালে সানন্দবাড়ী তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জ পুলিশের কাছে শিশুটির লাশ হস্তান্তর করেছে।
সিলেট : সালুটিকর-গোয়াইনঘাট, গোয়াইনঘাট-সারিঘাট সড়কসহ উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি রাস্তা। উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, বন্যায় প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম মহসিন বলেন, রাস্তার উপরে পানি থাকাবস্থায় ভারি যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষেধ। রাস্তা থেকে পানি নামার ৪-৫ দিন পর স্বাভাবিক নিয়মে গাড়ি চলাচল করতে পারবে।

Aviation News