কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, পরিচালক বরখাস্ত

এই লেখাটি 648 বার পঠিত
IMG_15112019_085420_(728_x_410_pixel)

কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, পরিচালক বরখাস্ত।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পর এবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দুর্নীতি প্রতিরোধে তৎপর হয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (প্রথম পর্যায়) ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে সরকারের ক্ষতি হয়েছে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা। বিমানবন্দরটির সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও মিলেছে দুর্নীতির প্রমাণ। মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে প্রমাণ হয় যে, এসব দুর্নীতের সঙ্গে জড়িত বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুল হাসিব, তিনি এই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশের ভিত্তিতে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের ও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বেবিচক।

জানা গেছে, এই বছর ৩ মার্চ সচিবালয়ে দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সংক্রান্ত অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর কাছে। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ কার হয়- বেবিচকে ১১ ও বিমানে ৮ ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে ১১টি সুপারিশ পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

প্রতিবেদনে বলা হয়- মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, ক্রয় খাত, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, নির্মাণ, উন্নয়ন কাজ, পরামর্শক নিয়োগ, কর্মী নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি, বিমানবন্দরের স্পেস, স্টল ও বিলবোর্ড ভাড়াসহ ১১ ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে সিভিল এভিয়েশনে।

বিমান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দুদকের প্রতিবেদন পাওয়ার পর দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে তৎপর হয় মন্ত্রণালয়। বিমান সচিব মো. মহিবুল হক একাধিক কমিটি করেন বিমান ও বেবিচকের দুর্নীতি চিহ্নিত করতে। প্রথমে বিমানে বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতির প্রমাণ পায় মন্ত্রণালয়। এরপর বিমানের একাধিক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত, চাকরিচ্যুত ও বদলি করা হয়। একই সঙ্গে বেবিচকেও চলে মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধান। বেবিচকের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকেও করা হয় বদলি।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে দুর্নীতি ও কর্তব্য পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বেবিচক-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (প্রথম পর্যায়) পরিচালক মো. আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় ১৪ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে বেবিচকের চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৮৮ এর ৩৯(ক), ৩৯(ঘ), ৩৯(ঙ) এবং ৩৯(চ) ধারায় দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অদক্ষতা, দুর্নীতি পরায়ণতা এবং আত্মসাৎ এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেবিচকের চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৮৮ এর ৪৫(১) ধারার বিধানে তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১২ সালে ৪ অক্টোবর কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান বেবিচকের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুল হাসিব। মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে ধরা পড়ে- কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের জন্য জেলায় (০৪/২০১৫-২০১৬ নম্বর) ভূমি অধিগ্রহণ কেসের ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ চাহিদা মোতাবেক অর্থ যথাসময়ে জমা না দেওয়ায় সরকারের কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি ও দুর্নীতি হয়েছে।  প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য কক্সবাজার জেলায় (০৪/২০১৫-২০১৬ নং) ভূমি অধিগ্রহণ কেসে ৬৯ কোটি ২৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা গত ২৩ মের মধ্যে জমা দিতে চিঠি পাঠায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই অর্থ জেলা প্রশাসকের তহবিলে জমা দেওয়া প্রকল্প পরিচালক হিসেবে মো. আমিনুল হাসিবের দায়িত্ব ছিল। কিন্তু দুর্নীতি, অদক্ষতা ও ব্যর্থতার কারণে প্রকল্প পরিচালক নির্ধারিত সময়ে অর্থ জমা দেননি। ফলে আইন অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণ কেসটি বাতিল হয়ে যায়। প্রকল্পটি পুরাতন ভূমি অধিগ্রহণ আইনের আওতায় হওয়ায় ক্ষতিপূরণ বাবদ জমির দেড় গুণ অর্থ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু অধিগ্রহণ কেসটি বাতিল হওয়ায় এখন সেটি ২০১৭ সালের আইনের আওতায় সম্পন্ন করতে হবে। এ কারণে জমির মূল্য তিন গুণ এবং এ সময়ে উক্ত এলাকায় জমির বর্ধিত মূল্যের হারে পরিশোধ করতে হবে। এজন্য সরকারের কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে।

তদন্তে প্রমাণিত হয়, মো. আমিনুল হাসিব স্থানীয় ভূমি মালিক ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কিছু কর্মচারীর সঙ্গে মিলে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করে অতিরিক্ত অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে নিজে আত্নসাৎ করার ষড়যন্ত্র করেছেন। প্রকল্প পরিচালকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতায় ভূমি অধিগ্রহণ কেসটি বাতিল হলেও দীর্ঘ চার মাসেও ভূমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর নতুন করে আবেদন করা হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (প্রথম পর্যায়) একটি কমপনেন্ট হিসেবে বিমানবন্দরের ৩৭ কোটি টাকা সীমানা প্রাচীর স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়নি। প্রকল্প পরিচালকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে এই প্রকল্পের কাজে মারাত্মক ত্রুটি হয়েছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন মো. আমিনুল হাসিব। গত বছর ৪ নভেম্বর প্রকল্পটির ডিপিপি সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রধিকার থাকা সত্ত্বেও ডিডিপি অনুমোদিত হওয়ার এক বছর পরও টেন্ডার জারি করেননি প্রকল্প পরিচালক। তার ব্যক্তিগত অদক্ষতা ও ব্যর্থতায় সরকারি কার্যক্রম ধীরগতি হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি মারাত্নকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নির্দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন। তদন্তে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্নসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বেবিচককে নির্দেশ দেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে বেবিচক ব্যবস্থা নিয়েছে।’

Aviation News