ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশ বিমান বহরে যোগ হচ্ছে আরও পাঁচ উড়োজাহাজ

এই লেখাটি 4110 বার পঠিত
085850biman-787-dreamliner

ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশ বিমান বহরে যোগ হচ্ছে আরও পাঁচ উড়োজাহাজ।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিমান বহরে যোগ হচ্ছে আরও পাঁচটি উড়োজাহাজ। বোয়িং থেকে দুটি নিউ ব্র্যান্ডের ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৯ এবং কানাডার বোমবারডিয়ার থেকে তিনটি ড্যাশ-৮ কিউ ৪০০ সংগ্রহ করার প্রস্তুতি চলছে। দুটি কোম্পানির সঙ্গে এখন চলছে চূড়ান্ত প্রক্রিয়া। এ জন্য বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন বোয়িংয়ের এক ভাইস প্রেসিডেন্ট। গত দুদিন ধরে বিমানের সদর দফতর বলাকায় দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে বোয়িং ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। জানা গেছে, একটি ড্রিমলাইনের বর্তমান বাজার দর এগারো শত কোটি টাকা হলেও বিমান সেটা হাজার কোটি টাকার নিচে রাখার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে ব্যবধান খুব কাছাকাছি এসেছে। বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়েল সচিব মহিবুল হক জানিয়েছেন, আমরা ড্রিমলাইনের প্রকৃত বা বাজারমূল্যের আরও অনেক কমে কিনতে পারব বলে দৃঢ় বিশ্বাসী। এটা আসলে আমাদের সামনে একটা সুবর্ণ সুযোগ বলা চলে।

বোয়িং কোম্পানি তিনটি মডেলের ড্রিমলাইনার তৈরি করছে। ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৯ মডেলের উজোহাজের মধ্যে একটি। এর দৈর্ঘ্য ২০৬ ফুট। এই মডেলের একটি উড়োজাহাজের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এটি ৩০০ যাত্রী বহন করতে পারে। এটি টানা প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার উড়তে পারে। এই মডেলের দুটি উড়োজাহাজ বাজারমূল্যের চেয়ে খানিকটা কমে কিনতে পারবে বাংলাদেশ।

জানা গেছে, এ দুটি ড্রিমলাইনার কেনার জন্য প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিমানের সর্বশেষ বোয়িং রাজহংস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। তার সবুজ সঙ্কেত পেয়েই পাওয়ার পর দ্রুত ওই দুটি ড্রিমলাইনার কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ জন্য বেশ কয়েক দফা বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে বিমান কর্তৃপক্ষের আলোচনা হয়। এ বিষয়ে সচিব মোঃ মহিবুল হক বলেন, ‘যে দুটি ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৯ আমরা কিনতে যাচ্ছি, সেগুলো তৈরি হয়ে আছে। চীনের একটি বিমান পরিবহন সংস্থার এগুলো কেনার কথা ছিল। তারা এখন উড়োজাহাজগুলো কিনছে না। বোয়িং কোম্পানিও আমাদের কাছে বাজারমূল্যের চেয়ে কিছুটা কম দামে বিক্রি করতে চাইছে। তবে আমরা দর-কষাকষি করছি। আশা করছি, উড়োজাহাজ দুটি ডিসেম্বর মাসের দিকে দেশে আসবে।

নতুন দুটি ৭৮৭-৯ মডেলের ড্রিমলাইনার এলে বিমানের নিজস্ব উড়োজাহাজের সংখ্যা হবে ১২টি। এর মধ্যে ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৮ চারটি, ৭৮৭-৯ দুটি, ৭৭৭-৩০০ইআর চারটি, ৭৩৭-৮ দুটি। এর বাইরে লিজের রয়েছে তিনটি ড্যাশ-৮, দুটি ৭৩৭ ও একটি ৭৭৭। সব মিলিয়ে বহর হবে ১৮টির।

বিমান সূত্র জানায়, যে দুটি ড্রিমলাইনার কেনার আলোচনা চলছে, সেগুলোর ক্রেতা ছিল চীনের হেইনান এয়ারলাইন্স। বোয়িং কোম্পানিকে নতুন করে আরও ৭৬ উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার দিয়েছে তারা। এর ২৮ ড্রিমলাইনার বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের উড়োজাহাজ ছিল। কিন্তু মার্কিনদের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে হেইনান বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার বন্ধ করে দেয়। এ কারণেই বোয়িং কোম্পানির কাছে রয়েছে বেশ কয়েকটি ড্রিমলাইনার।

এদিকে কানাডা থেকে তিনটি ড্যাশ কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে এগুলো ঢাকায় আনা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে বিমানের একজন পরিচালক। এ তিনটি উড়োজাহাজ কিনতে জিটুজি (গবর্নমেন্ট টু গবর্নমেন্ট) প্রক্রিয়ায় গত বছরের ১ আগস্ট চুক্তি করে বিমান। তবে বিনা দরপত্রে উড়োজাহাজ কেনায় বাদ সাধেন নেগোসিয়েশন কমিটির এক সদস্য। কিন্তু কাজ এগিয়ে নিতে পরিবর্তন আনা হয় সেই কমিটিতে। এখন সরাসরি উড়োজাহাজ কেনায় সবাই ঐকমত্যে পৌঁছায় আটঘাট বেঁধে নেমেছে বিমান কর্তৃপক্ষ। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ৬ থেকে ৭ মাসের মধ্যেই ড্যাশ-৮-কিউ ৪০০এনজি মডেলের এয়ারক্রাফটগুলো বিমান বহরে যোগ হবে। আর এগুলো কেনা হচ্ছে কানাডার প্রতিষ্ঠান বোমবারডিয়ার ইনকের মাধ্যমে।

সূত্র জানায়, বোমবারডিয়ারের উড়োজাহাজ তিনটির দাম নির্ধারণ নিয়ে শুরুর দিকে বেশ জটিলতা ছিল। প্রাথমিকভাবে প্রতিটি উড়োজাহাজের নিট মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২২ দশমিক ৪২২ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে উড়োজাহাজ তিনটির মোট মূল্য দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ২৬৬ মিলিয়ন ডলার। অবশ্য এ দর উড়োজাহাজ সরবরাহের সময়ে এ্যাসকালেশন ফ্যাক্টর (ধাপে ধাপে বৃদ্ধি) অনুযায়ী পুনর্নির্ধারিত হবে। চলে চিঠি চালাচালি। নেগোসিয়েশন কমিটির সভায় উড়োজাহাজের দাম নির্ধারিত না হওয়ায় চুক্তি করা সম্ভব হচ্ছিল না। অর্থ বিভাগের একজন প্রতিনিধি এ প্রক্রিয়ায় উড়োজাহাজ কেনার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২ নবেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে নেগোসিয়েশন কমিটিতে পরিবর্তন এনে বিমান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে (বিমান) আহ্বায়ক করা হয়। আবারও দফায় দফায় চিঠি চালাচালির পর ২১ দশমিক ৫৯৭ ডলার হিসেবে প্রতিটি উড়োজাহাজের দাম নির্ধারণের কথা বলা হয় কানাডীয় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে। নেগোসিয়েশন কমিটিকে কানাডীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়- বাংলাদেশ বিমানকে উড়োজাহাজের যে মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে, এর চেয়ে কম মূল্যে ‘বাংলাদেশী’ এয়ারলাইন্সকে তিন বছরের মধ্যে প্রস্তাব করা হবে না। তা করলে উভয় মূল্যের পার্থক্য বিমানকে ফেরত দেয়া হবে। এর পর গত বছরের ১ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বিমান কর্তৃপক্ষ উড়োজাহাজ তিনটি কেনার চুক্তি করে। সে অনুযায়ী, উড়োজাহাজগুলোর ক্রয়মূল্য ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রতি বছর ২ শতাংশ বর্ধিত হারে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২০ সালে ডেলিভারির সময় ২৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। আর তিনটির দাম দাঁড়াবে ৭২ মিলিয়ন ডলার। তা ছাড়া ক্রয়মূল্যের সমপরিমাণ ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে এককালীন ঋণের ফিসহ প্রয়োজনীয় ঋণের পরিমাণ হবে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার। চুক্তি অনুযায়ী, তিনটি উড়োজাহাজ এবং একটি স্পেয়ার ইঞ্জিন ও একটি স্পেয়ার এপিইউর (অক্সিলিয়ারি পাওয়ার ইউনিট) ডেলিভারি করা হবে ২০২০ সালের মধ্যে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিমানের বোর্ড সভায় অনুমোদন পায় সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণের প্রস্তাবটি। ডেলিভারি ফাইন্যান্সিংয়ের জন্য ১০ বছর মেয়াদী ঋণ এবং সুদের হার তিন মাসের লাইবর পিরিয়ডের সঙ্গে ১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। এ ঋণের রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দিতে গত ২৮ মে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ও। এ ক্ষেত্রে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হতে যাওয়া খসড়া চুক্তির ওপর আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং দরকার। তাই খসড়া প্রস্তাবটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে পাঠানোর জন্য বিমানের পক্ষ থেকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। এদিকে প্রথমে উড়োজাহাজ সরবরাহের কথা ছিল ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর ও নবেম্বর এবং ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এখন তা এগিয়ে করা হয়েছে আগামী বছরের মার্চ, মে ও জুন।

জানতে চাইলে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন বলেন, এগুলো বহরে যোগ হলে বিমানের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা আরও বাড়বে। উড়োজাহাজ কেনার অর্থ জোগাড়ে সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে বিমানের চুক্তি হবে। এটির খসড়া ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। এর পর উড়োজাহাজের প্রি-শিপমেন্ট বাবদ টাকা পাঠানো হবে।

জানা গেছে, এর আগে বোয়িং কেনার সময় ডেলিভারি পেমেন্ট বাবদ স্বল্প সুদে ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল কানাডীয় প্রতিষ্ঠান মারিয়ানা প্রাইভেট লিমিটেড। পরবর্তীতে তারা পিছু হটায় বিপাকে পড়ে বিমান। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিক নিজস্ব উৎস এবং অন্যান্য ব্যাংকের সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছিল সংস্থাটি। তাই এবার কানাডার ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান কানাডিয়ান কমার্শিয়াল কর্পোরেশনের (সিসিসি) আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে বেশি জোর দিয়েছিল বিমান কর্তৃপক্ষ। ফলে ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল প্রস্তাব পাওয়ার পরও তা চূড়ান্ত করতে অনেক সময় পার হয়ে যায়। আবার উড়োজাহাজের মূল্য নির্ধারিত না হওয়ায় চুক্তি করা যাচ্ছিল না। তা ছাড়া জিটুজি পদ্ধতি হওয়ায় আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাইসহ নানা বিবেচনায় কর্মকর্তাদের মধ্যে একমত হতেও সময় লাগে। কানাডার পাঠানো প্রস্তাব অনুযায়ী উড়োজাহাজের মূল্যের প্রায় ৮০ শতাংশ টাকা দেবে কানাডা সরকারের একটি ফিন্যান্সিং এ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স এজেন্সি ‘এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট কানাডা (ইডিসি)’।

এদিকে বোয়িং থেকে যে দুটি ড্রিমলাইনারের দাম নির্ধাারণ নিয়ে ঢাকায় বৈঠক চলছে তাতে অনেকটাই অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সচিব মহিবুল হক। তিনি জানিয়েছেন, এখানে উভয়পক্ষের উইন উইন সিচুয়েশান থাকবে। সময় হলে এ সম্পর্কিত চুক্তির সবই প্রকাশ করা হবে। যাতে উড়োজাহাজ কেনা নিয়ে কোন ধরনের প্রশ্ন সন্দেহ ও সংশয় না থাকে কারোর। অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও সততার মাধ্যমে ডিল করা হবে এটি।

Aviation News