সড়কে ভোগান্তি, রমরমা বাণিজ্য আকাশপথে

এই লেখাটি 95 বার পঠিত

সড়ক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ঘরমুখো যাত্রীরা। ভাঙ্গাচোরা-সড়ক মহাসড়কে যানজট ভয়াবহ হওয়ায় বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন আকাশ ও রেলপথ। ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের এমন সঙ্কটের সুযোগটা বেশ ভালভাবেই কাজে লাগিয়েছে এয়ারলাইন্সগুলো। এখন এয়ারলাইন্সগুলোর পোয়াবারো অবস্থা। আকাশপথের চরম চাহিদায় আকাশছোঁয়া দাম বাড়ানো হয়েছে টিকেটের। পাঁচ হাজার টাকার টিকেট বার হাজারেও মিলছে না। যাত্রী চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনা করছে এয়ারলাইন্স-গুলো। এবারের ঈদেই রমরমা বাণিজ্য করছে বিমান, ইউএস-বাংলা, রিজেন্ট ও নভোএয়ার। সুযোগ থাকলে আরও ফ্লাইট বাড়ানো হতো। ঈদ যাত্রায় আকাশপথে যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে অভ্যন্তরীণ রুটে এবার বাড়তি ৬৩টি ফ্লাইট অপারেট করা হবে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী, সৈয়দপুর ও বরিশাল রুটে চলবে এগুলো। নভোএয়ার অতিরিক্ত ২৪টি, ইউএস-বাংলা ৩৫টি এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চারটি ফ্লাইট বাড়তি পরিচালনা করবে। এয়ারলাইন্সগুলোর আবেদনের পর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচক এই অনুমোদন দেয়। ঈদের পনের দিন আগে ও পরের যাত্রীদেরকেই ঘরমুখো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ হিসেবে ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে কমপক্ষে দুই লাখ যাত্রী পরিবহন করবে চারটি এয়ারলাইন্স। অবশ্য ঈদে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ দেশে বাড়তি ফ্লাইট পরিচালনা করছে না। তবে কুয়ালালামপুর-টু-ঢাকা রুটে পাঁচটি অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনা করবে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক সোহেল মজিদ। রিজেন্টের সিইও আশীষ রায় চৌধুরী জানিয়েছেন, মানুষ দায়ে ঠেকে টাকা বেশি দিয়ে হলেও আকাশপথকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ মহাখালী থেকে উত্তরবঙ্গগামী বাসযাত্রীরা জয়দেবপুর চৌরাস্তা পার হতেই সময় লাগে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। সেখান থেকে টাঙ্গাইল যেতে লাগে আরও চার ঘণ্টা। মহাখালী থেকে টাঙ্গাইলে দুই ঘণ্টার ভ্রমণে যদি আট ঘণ্টা লাগে- তাহলে যাত্রীর তো প্রাণ ওষ্ঠাগত হবেই। সড়ক তখন তার কাছে অভিশপ্ত। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই যাত্রীরা সড়ক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যদিও আকাশপথ অনেক ব্যয়বহুল। তবুও সময় এবং দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে মানুষ আকাশপথের যাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। যারা আকাশপথের ব্যয় মেটাতে অক্ষম তারা তখন রেলপথকেই বেছে নিচ্ছেন।
সিভিল এভিয়েশন জানিয়েছে, শুধু সড়কপথের ভোগান্তি নয়, মানুষের এখন ক্রয়ক্ষমতাই বেড়ে গেছে। আকাশপথের চাহিদার চাপ থেকেই বোঝা যায় মানুষ কতটা সক্ষমতায় আছে। নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এয়ারলাইন্সগুলো ঈদের আগে ও পরের আরও অতিরিক্ত ফ্লাইটের অনুমতি নিয়েছে।
বিমান জানিয়েছে, তিনটা ড্যাশ-৮ দিয়ে সবগুলো অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটের পাশাপাশি সিলেট ও চট্টগ্রামে সুপরিসর বোয়িং-৭৭৭ অপারেট করা হয়। এত গড়পড়তা দৈনিক যে যাত্রীবহন করে তা এই একমাসে অর্ধ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। একই অবস্থা ইউএস-বাংলা, নভো এয়ার ও রিজেন্টের। এ চারটি অপাারেটর মিলিয়ে ঈদযাত্রী বহন করবে কমপক্ষে ২ লাখ। যা অভ্যন্তরীণ আকাশপথের জন্য মাইল ফলক হিসেবে বিবেচিত হবে বলে জানিয়েছেন ইউএস-বাংলা মুখপাত্র কামরুল ইসলাম। তিনি জানান, এবার ইউএস-বাংলা যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ভাড়ার ওপর আকর্ষণীয় মূল্যহ্রাস প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এবার সর্বনিম্ন ১৮৯৯ টাকাও ভাড়া ঘোষণা করা হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে ইউএস-বাংলা ভাড়াও কমিয়েছে। এ সুযোগ ঈদের আগে ৭ জুন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত থাকবে। ঈদ আগে ৭ জুন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সকল প্রকার ট্যাক্স ও সারচার্জসহ যশোর, রাজশাহী, বরিশাল ও সৈয়দপুর থেকে ঢাকা ভ্রমণের জন্য সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮৯৯ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭ জুন থেকে যশোর, সৈয়দপুর, বরিশাল এবং রাজশাহী রুটে অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। এছাড়াও সিডিউল অনুযায়ী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স প্রতিদিন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ছয়টি, যশোরে দুইটি, কক্সবাজারে দুইটি, সৈয়দপুরে দুটি, সিলেট ও রাজশাহীতে একটি এবং সপ্তাহে তিনটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করবে বরিশালে।
নভো এয়ারের মুখপাত্র নিলাদ্রি মহারত্ম জানান, এখন সকালে ঢাকা টু রাজশাহী একটি ফ্লাইট চলছে। ঈদ উপলক্ষে একটি ফ্লাইট বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১২ থেকে ১৬ জুন প্রতিদিন দুইটি ফ্লাইট চলবে। এছাড়া টিকেট বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে টিকেট বিক্রি আরও বাড়বে। যাত্রী বাড়ছে, ফ্লাইট বাড়ছে, ব্যয়ও বাড়ছে। তিনি বলেন, যাত্রীরা যেসব টিকেটের দাম আট হাজার বলছেন, তা একটি ফ্লাইটের মোট আসনের মাত্র ১০ শতাংশ। ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ টিকেট কম দামেই বিক্রি হয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশ টিকেট বিক্রি হয়েছে মধ্যম দামে। উড়োজাহাজের টিকেট সারাবিশ্বে একই নিয়মে বিক্রি হয়। শেষ মুহূর্তে টিকেটের দাম বেশি থাকে। ঈদ উপলক্ষে নভোএয়ার মোবাইল এ্যাপে প্রোমো কোর্ড ব্যবহার করে যাত্রীরা টিকেটের ওপর ১০% ছাড় নিতে পারেন।
এদিকে সর্বশেষ শুক্রবার পর্যন্ত জানা গেছে, ঈদের আগের অভ্যন্তরীণ রুটের টিকেট বিক্রি শেষ হয়ে গেছে আরও দু সপ্তাহ আগেই। এখন কিছু টিকেট মিললেও টাকা গুণতে হচ্ছে তিন থেকে চারগুণ বেশি। যেমন- ঢাকা থেকে সৈয়দপুর রুটে আগে টিকেট বিক্রি হতো সর্বোচ্চ তিন হাজার ২০০ টাকায় (ওয়ানওয়ে)। এখন দাম আট হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ টাকা। ঢাকা-যশোর রুটের দুই হাজার ৫০০ টাকার টিকেট বিক্রি হচ্ছে আট হাজার টাকায়। ঢাকা থেকে বরিশাল রুটের তিন হাজার টাকার ওয়ানওয়ে টিকেটের দাম রাখা হচ্ছে সাত হাজার ৫০০ থেকে আট হাজার ৫০০ টাকা। ঢাকা-রাজশাহী রুটের টিকেটও বিক্রি হচ্ছে আট হাজার টাকায়, যা স্বাভাবিক সময়ে তিন হাজার টাকা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ছয় থেকে আট হাজার, কক্সবাজার আট থেকে ১২ হাজার এবং সিলেট রুটে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকায় টিকেট কিনতে হচ্ছে যাত্রীদের।
মতিঝিল বিমান অফিসে সুখেন নামের এক যাত্রী জানান, বেসরকারী এয়ারলাইন্সগুলোর ভাড়া বেশি হওয়ায় বিমানের টিকেটের জন্য এসেছিলাম। কক্সবাজারের টিকেট পেলাম না। ১৫ জুন একটি মাত্র টিকেট আছে, ভাড়া প্রায় ৯ হাজার। স্ত্রী-সন্তানসহ একটি টিকিটে হবে না, তাই ফিরে যাচ্ছি। অপর এক যাত্রীর অভিযোগ, স্বল্প মূল্যের টিকেট ব্লক করে রেখে ইকোনমি ক্লাসেও চড়া মূলে হাঁকিয়ে যাত্রীদের পকেট কাটছে এয়ারলাইন্সগুলো। ঈদের সময় স্বল্প ভাড়ার টিকেটগুলো কোন কোন এয়ারলাইন্স ক্লক করে আপার ক্লাসে রেখে দেয়। ফলে শুরু থেকেই ভাড়া বেশি দেখায়।
ইউএস-বাংলার মুখপাত্র কামরুল ইসলাম টিকেটের চড়া দাম সম্পর্কে বলেন, সাধারণত আটটি স্ল্যাবে টিকেট বিক্রি হয়। এর মধ্যে কম ভাড়ার টিকেট অনেক আগেই বিক্রি হয়ে যায়। ফলে এখন টিকেট কিনতে গেলে সর্বোচ্চ ভাড়ার টিকেট পাওয়া যাবে এবং এতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ভাড়া কিছুটা বেশি পড়বে। অন্য সময় যাওয়া-আসা দুই পর্যায়েই ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ যাত্রী থাকে। ঈদে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ যাত্রী পাওয়া যায় ফিরতি ফ্লাইটে। তাই তেলের খরচও উঠে আসে না। এ কারণেই ওয়ানওয়ে টিকেটের একটি অংশে ভাড়া সর্বোচ্চ হয়ে যায়। তবে ফিরতি ফ্লাইটে যাত্রী আকর্ষণে ইউএস-বাংলা চারটি গন্তব্য থেকে ঢাকায় সর্বনিম্ন এক হাজার ৮৯৯ টাকায় টিকেট বিক্রি করছে।

Aviation News