বিমানের ড্রিমলাইনার উড়বে না দূরের গন্তব্যে

এই লেখাটি 217 বার পঠিত

টানা ১৬ ঘণ্টা উড়তে সক্ষম বোয়িং-৭৮৭ ‘ড্রিমলাইনার’। বিমানের বহরে দুটি ড্রিমলাইনার যুক্ত হচ্ছে এ বছরই। আরো দুটি যুক্ত হবে আগামী বছর। যদিও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ক্যাটাগরি পরিবর্তন না হওয়ায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এ উড়োজাহাজকেও উড়তে হবে ১৬ ঘণ্টার কম অর্থাৎ স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের গন্তব্যে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেবিচক এখনো দ্বিতীয় ক্যাটাগরির নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় নিউইয়র্কের মতো বড় দূরত্বে ড্রিম লাইনার দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ মিলবে না। যদিও নতুন প্রজন্মের এ উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার প্রধান লক্ষ্যই ইউরোপ-আমেরিকার মতো দীর্ঘ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সূত্রমতে, চলতি বছরের আগস্টে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংয়ের কাছ থেকে আসছে প্রথম বোয়িং ৭৮৭-৮ উড়োজাহাজটি। দ্বিতীয়টি আসবে নভেম্বরে এবং বাকি দুটি ড্রিমলাইনার আসবে ২০১৯ সালের শেষদিকে। এগুলোর নাম হবে যথাক্রমে ‘আকাশবীণা’, ‘হংসবলাকা’, ‘গাঙচিল’ ও ‘রাজহংস’। দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট সর্বাধুনিক এ উড়োজাহাজে আসনসংখ্যা হবে ২৭১। বোয়িং ৭৬৭ উড়োজাহাজের চেয়ে ২০ শতাংশ কম জ্বালানি লাগবে। আর উড়তে পারবে টানা ১৬ ঘণ্টা।
দীর্ঘ সময় উড়তে সক্ষম এ উড়োজাহাজও উড়বে ঢাকা-কলম্বো-মালে-ঢাকা, ঢাকা-হংকং-ঢাকা এবং ঢাকা-ক্যানটন (গুয়াংজু)-ঢাকার মতো ছোট দূরত্বের গন্তব্যে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে কলম্বো ফ্লাইট সময় ৩ ঘণ্টা ১০ মিনিট, কলম্বো থেকে মালে ১ ঘণ্টা ৯ মিনিট, ঢাকা থেকে হংকং ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট এবং ঢাকা থেকে ক্যানটন (গুয়াংজু) ফ্লাইট সময় ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট মাত্র।
বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হওয়ার আগে থেকেই নিউইয়র্কের মতো বড় দূরত্বে ফ্লাইট শুরু করার প্রক্রিয়া চালিয়ে আসছে বিমান কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না বেবিচক দ্বিতীয় ক্যাটাগরির নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত থাকার কারণে। কারণ বেবিচক থেকে রেজিস্ট্রেশন করা কোনো উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছে না। মূলত ফ্লাইট নিরাপত্তায় দুর্বলতার কারণে বেবিচককে দ্বিতীয় ক্যাটাগরির নিয়ন্ত্রণ সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)। একই কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া কোনো উড়োজাহাজেরও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি নেই। ফলে বহরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সক্ষম উড়োজাহাজ থাকলেও ছোট দূরত্বের রুটেই ফ্লাইট কার্যক্রম সীমিত রাখতে হচ্ছে বিমানকে, যা লোকসান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বিমানের অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ এ প্রসঙ্গে বলেন, বেবিচক ক্যাটাগরি ২-এ থাকায় নিউইয়র্ক রুটে ফ্লাইট চালানো সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণে বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দিয়ে আপাতত লন্ডন রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো হবে। এছাড়া গুয়াংজু, কলম্বো, মালে রুটেও ড্রিমলাইনার দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। কুয়েত, মদিনাতেও ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা আছে। তবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বহরে আরো দুটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ যুক্ত হবে। উড়োজাহাজ দুটি যুক্ত হলে কলম্বো ও মালে রুটে বোয়িং ৭৩৭ ব্যবহার করা হবে। আর নভেম্বর নাগাদ দ্বিতীয় ড্রিমলাইনার যুক্ত হলে সেটি দিয়ে ম্যানচেস্টার, রোম, সিডনি, মন্ট্রিয়ল, দিল্লি, হংকং ও টোকিওতে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বিমানের।
তবে শিগগিরই ক্যাটাগরি ১-এ উন্নয়নের আশা করছে বেবিচক। বেবিচকের পরিচালক (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশনস) উইং কমান্ডার চৌধুরী এম জিয়াউল কবির এ প্রসঙ্গে বলেন, গত ১১ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি এফএএর নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এফএএর চূড়ান্ত মূল্যায়ন সম্পন্ন হবে আরো দুটি কারিগরি সমীক্ষা সম্পন্ন করার পর। এ সমীক্ষার সফলতা অর্জন করলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এফএএর ক্যাটাগরি রেটিং-১ অর্জনে সক্ষম হবে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি নিউইয়র্কে ফ্লাইট পরিচালনা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কীভাবে আরো উন্নতি ঘটানো যায়, সে চেষ্টাই করছে বেবিচক।
এর আগে ২০১১ সাল থেকে ধাপে ধাপে সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে বহরে যুক্ত করা হয় চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর(এক্সটেন্ড রেঞ্জ) উড়োজাহাজ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, একটানা লম্বা সময় উড়তে সক্ষম নতুন প্রজন্মের এসব উড়োজাহাজ যুক্ত করার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইউরোপ, আমেরিকার মতো দেশে লং রুট ফ্লাইট চালু করা। যদিও গত আট বছরে বেশি দূরত্বের মধ্যে কেবল ঢাকা-লন্ডন (১০ ঘণ্টা) রুটেই সীমাবদ্ধ বিমান। দীর্ঘ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও চালু করা যায়নি ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটের ফ্লাইট।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রুট ম্যাপ পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমানে বিমানের আন্তর্জাতিক রুট কেবল মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ই সীমাবদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে কুয়েত, দাম্মাম, দোহা, রিয়াদ, জেদ্দা, আবুধাবি, দুবাই ও মাস্কাটে ফ্লাইট রয়েছে বিমানের। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুরে ফ্লাইট চালাচ্ছে বিমান। এছাড়া স্বল্প দূরত্বে কলকাতা, ইয়াঙ্গুন ও কাঠমান্ডুতে ফ্লাইট রয়েছে এয়ারলাইনসটির। ইউরোপে কেবল লন্ডন রুটেই ফ্লাইট রয়েছে বিমানের। সে হিসেবে একটি রুটের জন্যই বিমান বহরে থাকছে লম্বা দূরত্ব পাড়ি দিতে সক্ষম ছয়টি উড়োজাহাজ।
লোকসানে থাকা বিমানকে মুনাফার ধারায় ফেরাতে ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আনা হয় চারটি বোয়িং-৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ। এগুলোর নামকরণ করা হয় পালকি, অরুণ আলো, আকাশ প্রদীপ ও রাঙা প্রভাত। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের নভেম্বরে আনা হয়েছে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের নতুন আরো একটি উড়োজাহাজ; যার নাম দেয়া হয়েছে ‘মেঘদূত’। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে বিমানের বহরে যোগ হয়েছে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ ‘ময়ূরপঙ্খী’। তারপরও সেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত আকাশ পরিবহন সংস্থাটি।

Aviation News