দেশজুড়ে আটকা পড়েছে প্রায় আড়াই লাখ পাসপোর্ট

এই লেখাটি 110 বার পঠিত

মিরপুরের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বাতজ্বরের রোগী। চিকিৎসা করাতে ভারত যাবেন। পাসপোর্টের জন্য তিনি আবেদন করেছেন ১৫ দিন আগে। যে জরুরি পাসপোর্ট সাত দিনের মধ্যে তাঁর হাতে আসার কথা, ১৫ দিনেও তা পাননি। পাসপোর্ট পেতে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, তা-ও জানেন না। পাসপোর্ট অফিস থেকেও পাওয়া যাচ্ছে না কোনো সদুত্তর। আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে তিনি এসব কথা জানান।

দেশজুড়ে হাবিবুর রহমানের মতো আরো অনেকে পাসপোর্ট করতে গিয়ে বর্তমানে এমন ভোগান্তির মধ্যে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত পাসপোর্ট বই সংকটে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যে বই রয়েছে, সেগুলো আগারগাঁও অফিসে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। জেলায় জেলায় থাকা পাসপোর্ট অফিসে চাহিদার অর্ধেকও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার পাসপোর্টের আবেদন করা হলেও পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি এই সংকট অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে প্রায় আড়াই লাখ পাসপোর্ট আটকা পড়েছে।

বছর দেড়েক আগে একবার পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সার্ভারে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় হাজার হাজার মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল। এবার অবশ্য সার্ভার সমস্যা নয়, পাসপোর্ট বই না থাকায় দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষ সমস্যায় পড়েছে। যে পরিমাণ পাসপোর্ট বই মজুদ রয়েছে, তাতে চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে ৫০ লাখ পাসপোর্ট বই ছাপিয়ে আনা হচ্ছে ইংল্যান্ড থেকে। আর ১০ লাখ বই শিপমেন্ট হয়েছে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ডিজি মেজর জেনারেল মাসুদ রেজওয়ান অবশ্য বলেন, ‘না, পাসপোর্ট বইয়ের সংকট নেই। আমাদের হাতে এখনো সাড়ে তিন লাখ বই আছে। ১০ লাখ বই আসছে। হঠাৎ করে চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। আগে যেখানে দিনে ১০-১৫ হাজার আবেদন জমা পড়ত, এখন জমা পড়ছে ২৫ হাজার আবেদন। এ কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি, সক্ষমতা আরো বাড়িয়ে সবাইকে পাসপোর্ট দিতে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এরই মধ্যে দেশজুড়ে প্রায় আড়াই লাখ আবেদনকারীর পাসপোর্ট আটকা পড়েছে। ঢাকায় পাসপোর্ট কিছু কমিয়ে স্বাভাবিক গতিতে কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু জেলা শহরের পাসপোর্ট অফিসগুলোতে বই সরবরাহ করা হচ্ছে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

এ অবস্থায় পাসপোর্ট নিয়ে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন খোদ পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই। তাঁরা জানান, প্রতি মাসে তিন লাখের বেশি পাসপোর্ট বই প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছে দুই লাখের মতো। এই বই শেষ হওয়ার আগেই নতুন বই না এলে পাসপোর্ট নিয়ে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। একজন কর্মকর্তা জানান, কিছুদিন আগে কিছু বই আনা হয়েছে। তা না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করত।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ই-পাসপোর্টের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করা হচ্ছিল। যে কারণে হাতে থাকা পাসপোর্ট বইগুলো শেষ হলে ই-পাসপোর্টে প্রবেশ করতে নতুন বই পাওয়া যাবে। ফলে পাসপোর্ট বই আনা হয়নি। কিন্তু ই-পাসপোর্টে প্রবেশ করতে দেরি হওয়ায় স্টকে থাকা পাসপোর্ট বই শেষ পর্যায়ে। বিপুল চাহিদা থাকার কারণে এখন আরো ৫০ লাখ বই ইংল্যান্ড থেকে আনা হচ্ছে। দু-এক সপ্তাহের মধ্যে শিপমেন্ট করা বইগুলো দেশে আসতে শুরু করলে এ সংকট আর থাকবে না।

প্রতিবেদক সরেজমিনে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয় পরিদর্শন করে জানান, গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা। ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের নিচতলায় বিশ্রামাগারে বিষণ্ন মনে বসে আছেন সদর উপজেলার শম্ভুগঞ্জ এলাকার উজ্জ্বল মিয়া (৩৬)। তিনি গার্মেন্টে চাকরি করেন। চাকরি নিয়ে বিদেশে যাবেন। জরুরিভাবে তাঁর পাসপোর্ট দরকার। নির্ধারিত ফি দিয়ে আবেদনও করেছেন। সাত কর্মদিবস শেষে তাঁর পাসপোর্ট পাওয়ার কথা। এর মধ্যে ১৪ দিন পার হয়ে গেছে। গতকাল পর্যন্তও তিনি পাসপোর্ট পাননি। এক সপ্তাহ ধরে রোজ অফিসে এসে খোঁজ নিচ্ছেন। গতকালও পাসপোর্ট না পাওয়ায় বিষণ্ন মনে বসে ছিলেন তিনি। উজ্জ্বল মিয়ার মতো আরো অনেকে প্রতিদিন এ অফিসে এসে পাসপোর্টের জন্য ধরনা দিচ্ছে। না পেয়ে কেউ কেউ তীব্র ক্ষোভও প্রকাশ করছে। কেউ প্রকাশ করেছে হতাশা।

ভালুকা উপজেলার হারুন অর রশিদ জানান, তিনি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি। নিয়ম অনুযায়ী ২১ কর্মদিবস পর তাঁর পাসপোর্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু প্রায় পৌনে তিন মাস পার হলেও এখনো তিনি পাসপোর্ট পাননি। তাঁকে জরুরিভাবে বিদেশে যেতে হবে। পাসপোর্টের জন্য প্রতি সপ্তাহে এই অফিসে ধরনা দিচ্ছেন। কিন্তু বই না থাকায় পাসপোর্ট পাচ্ছেন না। ময়মনসিংহে পাসপোর্ট করতে সুবিধা হবে এ চিন্তায় এই অফিসে আবেদন করেছিলেন গাজীপুরের ডা. সাইফুল ইসলাম। তিনিও দুই মাস ধরে পাসপোর্টের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন।

ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস সূত্র জানায়, প্রতি মাসে গড়ে পাঁচ হাজার বই ইস্যু হতো এ অফিস থেকে। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে অর্ধেকে নেমেছে। কর্মকর্তারা জানান, সমস্যাটি কেন্দ্রীয়ভাবে। স্থানীয়ভাবে তাঁদের কিছু করার নেই। পাসপোর্ট নিতে আসা লোকজনকে যতটুকু সম্ভব বুঝিয়ে বিদায় করা হচ্ছে।

ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সিনিয়র সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা বলেন, ‘সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা চলছে। আশা করছি, দ্রুতই আবেদনকারীদের হাতে পাসপোর্ট তুলে দিতে পারব।’

সিলেট থেকে আহমেদ নূর জানান, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) বইয়ের সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছে সিলেটের বহিরাগমনে ইচ্ছুক যাত্রীসাধারণ। প্রায় আড়াই মাস ধরে এই সংকট চলছে। ভুক্তভোগীরা জানায়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তারা যথাসময়ে পাসপোর্ট পাচ্ছে না।

গতকাল দক্ষিণ সুরমার আলমপুরে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সাধারণ পদ্ধতি ছাড়াও জরুরি পাসপোর্ট পেতে অতিরিক্ত ফি জমা দিয়েও কাজ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা। সাধারণ পাসপোর্টের জন্য দুই থেকে আড়াই মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনেককে। আর আর্জেন্ট পাসপোর্ট এক সপ্তাহে পাওয়ার কথা থাকলেও ১৫ দিনেও তা পাওয়া যাচ্ছে না।

একাধিক আবেদনকারী জানায়, ডেলিভারির নির্ধারিত তারিখ পার হওয়ার পরও দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে, কিন্তু তারা পাসপোর্ট বুঝে পাচ্ছে না। নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট পাওয়ার এসএমএস না পেয়েও অনেকে ছুটে আসছে অফিসে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছে, নির্ধারিত তারিখের পর মাস পেরিয়ে গেলেও তারা পাসপোর্ট বুঝে পাচ্ছে না।

সিলেট নগরীর বালুচরের বাসিন্দা ইয়াসির অভিযোগ করে জানান, পাসপোর্ট প্রদানের নির্ধারিত সময়ের দুই মাস পর রবিবার রাতে মেসেজ পেয়েছেন তিনি। গতকাল পাসপোর্ট নিতে এসেছেন। কিন্তু দুপুর ২টা পর্যন্ত বসে থেকেও পাসপোর্ট হাতে পাননি।

টাকার বিনিময়ে আবেদনকারীদের পাসপোর্ট সংগ্রহ করে দেওয়া একাধিক দালাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের মাধ্যমে অনেকে আবেদন করে। আমরা চ্যানেলের মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেই। কিন্তু পাসপোর্ট বই সংকট শুরুর পর আমরাও পাসপোর্ট যথাসময়ে জোগাড় করতে পারছি না। পরে ঢাকায় সরাসরি ‘কন্ট্রাক্ট’ করা হলে আমরা পাসপোর্ট পেতে শুরু করেছি।”

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক এ কে এম মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘পাসপোর্ট বই আসতে একটু দেরি হচ্ছে। আর দেরি হলে মানুষ কী প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। পাসপোর্টের আবেদন জমা হলে সাত থেকে আট দিনের মধ্যে সব প্রক্রিয়া শেষ করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা থেকে পাসপোর্ট বই এলে আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে আবেদনকারীর হাতে পৌঁছে দেই। কিন্তু ঢাকা থেকে বই আসতে দেরি হলে আমাদের করার কিছু থাকে না।’

তথ্যসূত্র: কালেরকণ্ঠ

Aviation News