বেবিচকের ৫ প্রকল্পের নথি তলব করলো দুদক

এই লেখাটি 466 বার পঠিত
দুদক

বেবিচকের ৫ প্রকল্পের নথি তলব করলো দুদক।

দুর্নীতির অভিযোগে শাহজালাল, শাহ আমানত, সিলেট ওসমানী ও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৫ প্রকল্পের ফাইল তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
একই সঙ্গে দুদক এসব প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানসহ ৯ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথি তলব করেছে। এদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
চিঠিতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তদন্ত করতে ১৯৯৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বেতনভাতা, অগ্রিম/ঋণ (কর্তনসহ) খাতভিত্তিক প্রদানের জন্য বলা হয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক জাহিদ কামাল স্বাক্ষরে ২১ মে এক চিঠিতে এসব নথি তলব করা হয়। একই সঙ্গে দুদকের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরে ১৩ মে এক চিঠিতে প্রকল্পগুলোর নথি তলব করা হয়।
চিঠি দুটিতে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়েছে কি না এবং এর সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে রাডার মেরামত, কেলিব্রেশন, এক্সপ্লোসিভ ডিটেনশন সিস্টেম স্থাপন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনালে বিনা টেন্ডারে ১৬ কোটি টাকার কাজ, বোর্ডিং ব্রিজের স্পেয়ার পার্টস ক্রয় এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত মেগা প্রকল্প অন্যতম।
দুদকের চিঠিতে এসব প্রকল্পের যাবতীয় নথি, স্টক রেজিস্টার, বণ্টন রেজিস্টার, ঠিকাদারদের নাম, টেন্ডার ডুকুমেন্ট, কাজের মূল্যায়নপত্র, ব্যয় মঞ্জুরি, বিল প্রদানসহ যাবতীয় কাগজপত্রের সত্যায়িত কপি প্রদানের জন্য বলা হয়েছে।
দুদক সূত্রে আরও জানা গেছে, সিভিল এভিয়েশনের আওতাধীন বিভিন্ন বিমানবন্দরের বড় বড় প্রকল্পের কাজ বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমোদন সাপেক্ষে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হয়। এসব কাজে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ দিতে হয় বলেও তাদের কাছে অভিযোগ আছে। শিগগিরই এ বিষয়েও অনুসন্ধান শুরু হবে।
সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট এক কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে এসব প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হয়। কিন্তু অভিযোগ আছে, সংশ্লিষ্ট শাখার ওই কর্মকর্তাকে ২ শতাংশ কমিশন না দিলে তিনি কোনো ফাইলই পাঠান না। উল্টো সেগুলো বেবিচকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক তদন্তে তারা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও ফাইল আটকে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ পেয়েছেন।
অভিযোগ আছে, ঘুষ না দিলে তিনি কোনো কাজই করেন না। এক মাসের কাজ এক বছর আটকে রাখেন। তার নিজস্ব সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য কাউকে কাজ দেন না। সিভিল ডিভিশন-১’এ গত ৫ বছর থাকাকালীন তিনি নিজের বন্ধুদের কাজ দিয়ে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
এভাবে তিনি বিপুল অর্থ-সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী হাবিবুর রহমান ছাত্রজীবনে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তার আত্মীয়স্বজন জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এর আগে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন কাজের প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে তার বিরুদ্ধে টেন্ডারে দুর্নীতির প্রমাণ পায় মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। এই অভিযোগে তাকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
টেন্ডারে বিভিন্ন ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমান সরকারের আমলে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে ঢাকা সার্কেল-১ এর দায়িত্বে ছিলেন। এই সময়ে তার অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও খামখেয়ালিপনা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বেবিচকের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। অভিযোগ আছে, তাকে যেখানে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, সেখানেই তিনি ষড়যন্ত্র করে কাজ বন্ধ করে দেন।
কিছুদিন আগে তাকে সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব দেয়া হলেও ইতিমধ্যে তার বিরদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছে দুদক। ওই প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে ইতিমধ্যে তিনি বুয়েটের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন।
বুয়েট যাতে তার কোনো প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত না হয়, সেজন্য তিনি এরকম দ্বন্দ্ব তৈরি করেন বলে তদন্তে জানা গেছে। দুদক থেকে তার এসব দুর্নীতি তদন্ত করে অনুসন্ধানপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদক কর্মকর্তা জাহিদ কামালকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বেবিচক সদরদফতর ভবন নির্মাণ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা হয়ে তিনি ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কাজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে তিনি অহেতুক বিলম্ব করেছেন। ঠিকাদারের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দেনদরবারের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পরই তিনি সবক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকেন। যার কারণে সদরদফতর ভবন নির্মাণ কাজের অগ্রগতি মারাত্মকভাবে বিলম্বিত হয়েছে। পাঁচ বছরেও সদরদফতর নির্মাণ প্রকল্প শেষ হয়নি।
ভবনের ফার্নিচারসহ ডেকোরেশনের কাজও তার সিদ্ধান্তের কারণেই বিলম্বিত হচ্ছে। অভিযোগ, তিনি ফাইল আটকে রেখে ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ বাণিজ্য করেন।
দুদকের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইতিমধ্যে হাবিবুর রহমান বেবিচক ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে গুরুত্বপূর্ণ ৭টি বিমানবন্দরের দায়িত্ব নিয়েছেন।
এর মধ্যে সরকারের মেগা প্রকল্প খান জাহান আলী বিমানবন্দর উন্নয়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নয়ন, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্যারালাল টেক্সিওয়ে, রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান টার্মিনালের সম্প্রসারণ নবরূপায়ণও এর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ ও বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ অন্যতম। দুদকের একটি চিঠিতে এসব কাজের নথিও তলব করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলছে, সেখানে তাকে সরকারের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের কাজের দায়িত্ব দেয়া ঠিক হয়নি। এতে প্রকল্পগুলোর উন্নয়ন কাজ বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
অভিযোগ আছে, ঠিকাদারের সঙ্গে বিলের পারসেন্টেজ নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের রানওয়ের শক্তিবৃদ্ধিকরণ কাজের বিল হাবিবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে আটকে রেখেছেন। তার চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ বাণিজ্য না করার কারণে তিনি ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করছেন না। এসব দুর্নীতির অভিযোগে একপর্যায়ে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক পদ থেকে মন্ত্রণালয় তাকে প্রত্যাহার করে নেয়। অথচ সে একই প্রকল্পে বেবিচক কর্তৃপক্ষ আবার তাকে এসি নিয়োগ দিয়েছেন। দুদকের পক্ষ থেকে এ নিয়েও কোনো ধরনের আন্ডারহ্যান্ডে ডিলিং হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে হাবিবুর রহমান পিডি থাকাকালীন এই প্রকল্পে যেসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেসব কাজের ফটোকপি তলব করেছে দুদক।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে সিলেট বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালের ভবন নির্মাণ কাজের টেন্ডারে মোট ৮টি দরপত্র পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে এ টেন্ডারের ভাগ্যও কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রথম টেন্ডারের মতো হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুদক থেকে এই প্রকল্পেও এখন পর্যন্ত যেসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেসব কাজের ফটোকপি তলব করা হয়েছে।
জানা গেছে, হাবিবুর রহমান বর্তমানে ৬টি বিমানবন্দরের মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ের শক্তি বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু তিনি প্রকল্প সাইটে না গিয়ে ঢাকায় থাকেন। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পে মনিটরিং কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সঙ্গে তার বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বুয়েটকে পাশ কাটিয়ে তিনি সব ধরনের কাজ নিজে করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে বুয়েটের পক্ষ থেকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে অবিলম্বে হাবিবুর রহমানকে সিলেট প্রকল্পের পিডি থেকে প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে বুধবার প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সিভিল এভিয়েশনে বড় কোনো প্রকল্পে কাজ করেননি। দুর্নীতি করার প্রশ্নই আসে না। দুদকের চিঠি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই চিঠি সিভিল এভিয়েশন হেডকোয়ার্টারকে দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে তিনি কিছুই জানেন না। কক্সবাজার প্রকল্প থেকে বাদ দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেটি কোনো দুনর্নীতর কারণে হয়নি। তৎকালীন একজন মন্ত্রীর কথা না শোনায় তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত নন বলে জানান।
পিডির পদ থেকে প্রত্যাহারের ব্যাপারে বুয়েটের চিঠি প্রসঙ্গে হাবিবুর রহমান বলেন, এ প্রকল্পে বুয়েটের পরামর্শকের সঙ্গে বিল নিয়ে মতের অমিল হয়েছে। পরামর্শক যে বিল দাবি করেছেন, তা সরকারি বিধিসম্মত নয়। ফলে তিনি বিল আটকে দিয়েছেন বলে দাবি করেন। তার ধারণা, এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বুয়েটের পক্ষ থেকে তাকে প্রত্যাহারের জন্য বেবিচককে চিঠি দেয়া হয়েছে।

যুগান্তর

Aviation News