অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না বেসরকারি এয়ারলাইনস

এই লেখাটি 192 বার পঠিত

বিদেশি এয়ারলাইনসের সঙ্গে ‘অসম’ প্রতিযোগিতায় হিমশিম খাচ্ছে যাত্রীবাহী বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো। এয়ারক্রাফট ক্রয়ে উচ্চ সুদের অর্থায়ন, বেশি দামের জেট ফুয়েল, এয়ারপোর্ট চার্জ, ভাড়ার প্রতিযোগিতা, যন্ত্রাংশ আমদানি, ব্যয়বহুল রক্ষণাবেক্ষণ, হ্যাঙ্গার, বন্ডেড ওয়্যারহাউসসহ বিভিন্ন বৈষম্যে তারা নানা সংকটে রয়েছে। পর্যাপ্ত নীতি সহায়তা, আর্থিক সক্ষমতার অভাব, ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, যুগোপযোগী ব্যবসায়িক কৌশলের অভাবসহ অসংখ্য কারণে বিদেশি এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে গত ২২ বছরে লাইসেন্স পাওয়া ১০টি বেসরকারি এয়ারলাইনসের মধ্যে সাতটি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে টিকে আছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও নভোএয়ার। বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি কাজে লাগিয়ে দেশের এভিয়েশন শিল্পের সিংহভাগই দখল করে আছে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং বাজার সম্প্রসারণে সরকারের নীতি সহায়তা আশা করছে দেশীয় বিমান সংস্থাগুলো।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানায়, বেসরকারি খাতে যাত্রীবাহী এভিয়েশন ব্যবসার ২২ বছরের যাত্রায় এ পর্যন্ত মোট ১০টি যাত্রীবাহী এয়ারলাইনস কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পায়। দেশে প্রথম ১৯৯৫ সালে বেসরকারি এয়ারলাইনস অ্যারো বেঙ্গলকে আকাশপথে চলাচলের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে অনুমতি পেলেও যাত্রা শুরু করতে অ্যারো বেঙ্গলের দুই বছর সময় লাগে। ১৯৯৭ সালে প্রথম যাত্রী পরিবহন শুরু করলেও ১৯৯৮ সালে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। অ্যারো বেঙ্গলের পর পর চালু হয়েছিল এয়ার বাংলাদেশ, জিএমজি, এয়ার পারাবত, রয়েল বেঙ্গল এয়ার, বেস্ট এয়ার ও ইউনাইটেড এয়ার। এদের মধ্যে জিএমজি ও ইউনাইটেড এয়ার আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও পরিচালনা করত। এই সাতটি এয়ারলাইনস অর্থসংকট দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১০ সাল থেকে রিজেন্ট এয়ার, ২০১৫ সাল থেকে নভো এবং ইউএস-বাংলা এয়ার ফ্লাইট অপারেশন করে এখনো টিকে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উড়োজাহাজের তেলের মূল্য, পার্কিং চার্জ, অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ অনেক বেশি। বিদেশি এয়ারলাইনসকে সেসব দেশের সরকার প্রদত্ত সুবিধা দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোকে দিতে সরকারের কিছু সহায়তা প্রয়োজন। এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এ সেবার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সম্ভব নয়।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাতটি নতুন এয়ারলাইনসহ মোট ৩১টি বিদেশি এয়ারলাইনস ৩৭টি গন্তব্যে ফ্লাইট ও কার্গো সেবা পরিচালনা করছে। বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দিনে ২৬৬টির বেশি ফ্লাইট পরিচালিত হয়। আর প্রতিবছর ৬০ লাখের বেশি যাত্রী বিমান পরিবহন সেবা নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক রুটে ২০১৩ সালে যাত্রী পরিবহন হয়েছিল ৫২ লাখ ৩১ হাজার ৫৮১ জন, যা পাঁচ বছরে বেড়ে ২০১৭ সালে দাঁড়ায় ৬৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫৫ জনে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে যাত্রী বেড়েছে ১১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৭ জন। এই বৃদ্ধির হার ২২.১০ শতাংশ। তবে বহির্গামী যাত্রীদের ৭০ শতাংশই বহন করছে বিদেশি এয়ারলাইনস। দেশীয় এয়ারলাইনসে যে ৩০ শতাংশ মানুষ যাতায়াত করে, তাদের ২৫ শতাংশ চড়ে বিমান বাংলাদেশে আর মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ বেসরকারি এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করে। বিকাশমান এ বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

তীব্র প্রতিযোগিতায় বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোকে টিকে থাকার জন্য সারচার্জ, এয়ারপোর্টের চার্জ, জ্বালানি খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লে. জেনারেল (অব.) এম ফজলে আকবর, এনডিসি, পিএসসি। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে বিমান পরিষেবায় অপারেটিং ব্যয় অনেক বেশি। এতে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের সঙ্গে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। আমাদের দেশে সারচার্জও অনেক বেশি। পরিশোধে দেরি হলে ৭৮ শতাংশ ইন্টারেস্ট দিতে হয়, যা খুবই বেশি। এটা কমানো উচিত। ভারতে এই হার ১০ শতাংশ। জিএমজি, ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের মতো এয়ারলাইনস বন্ধ হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে সব স্টেকহোল্ডার, সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এভিয়েশন খাতে সরকারি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং উন্নতমানের নয়। তার পরও এত বেশি অপারেটিং ব্যয় পৃথিবীর কোথাও নেই। জিএমজি, ইউনাইটেডসহ অনেক বেসরকারি এয়ারলাইনস শুরু করে পরে বন্ধ হয়ে গেছে। যখন তখন তেলের দাম বেড়ে যায়। আমাদের নগদে তেল কিনতে হয় বাড়তি দামে, যা বিমানের ক্ষেত্রে হয় না। এমনকি বিদেশি এয়ারলাইনসও ক্রেডিট সুবিধা পায়।

নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে এয়ারলাইনসের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদহার বেশি। ঢাকায় উড়োজাহাজের জ্বালানি তেলের দাম অতিরিক্ত। আন্তর্জাতিক পথে যে দামে জেট ফুয়েল কেনা যায়, অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটে একই তেল কিনতে বেশি টাকা দিতে হয়। সারচার্জ ও তেলের দামের এ বৈষম্যের জন্য ব্যবসা করা কঠিন। তেলের দাম বিশ্ববাজারে কমে গেছে অথচ বাংলাদেশে কমেনি। এত খরচ দিয়ে দেশি এয়ারলাইনসগুলোর ব্যবসা করে টিকে থাকা সম্ভব নয়।’

বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর এসব দাবি সম্পর্কে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান গতকাল বলেন, ‘আমাদের এয়ারলাইনসগুলো যথেষ্ট প্যাসেঞ্জার পাচ্ছে। আমরা তাদের সুযোগ-সুবিধা দিতে অনেক চার্জ কমিয়ে দিয়েছি। এ ব্যাপারে তারা সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে পারে। এসব অজুহাত তুলে এয়ারক্রাফট ঠিকমতো মেইনটেইন করবে না, অ্যাকসিডেন্ট হবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি জানান, বর্তমানে আরো তিন-চারটি প্রাইভেট এয়ারলাইনস ব্যবসায় আসতে তৈরি হয়ে আছে। এতে প্রমাণিত, যথেষ্ট লাভবান এই সেক্টর। এভিয়েশন শিল্পের সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে আজ বুধবার সংসদীয় কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ বলেন, ‘আমরা আমাদের উচ্চ পরিচালন ব্যয় যাত্রীদের ওপর চাপাতে পারছি না, কারণ তা অনেকের জন্য সাশ্রয়ী হবে না। আমরা যাত্রীদের প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া দিয়ে ভলিউম বাড়িয়ে ব্যয় নির্বাহের চেষ্টা করছি। আমাদের বিনিয়োগকারীরা ব্র্যান্ড ইমেজ বাড়ানোর অন্যান্য লাভজনক খাতে না গিয়ে সেবামূলক এই শিল্পে এসেছে। কিন্তু তারা কত দিন লোকসান গুনবে!’ তিনি বলেন, ‘বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দরকার। এ ছাড়া সারচার্জ তেলের দামের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা আনা প্রয়োজন। বিমান বাংলাদেশের জন্য সরকার একবার এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা মওকুফ করেছিল, কিন্তু আমাদের এক টাকাও ছাড়া দেওয়া হয় না। ভারতের এয়ারলাইনসগুলোর জন্য মোদি সরকার উড়াল নামে একটি স্কিম চালু করেছে, যেখানে দেশীয় এয়ারলাইনসের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের দেশের এয়ারপোর্টেও আমাদের বিদেশি এয়ারলাইনসের সমান হারে ল্যান্ডিংসহ অন্যান্য চার্জ দিতে হচ্ছে।’

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল গতকাল বুধবার বলেন, ‘প্রাইভেট এয়ারলাইনসগুলোর কী সমস্যা আছে, তা আমরা শুনব। তারা আমার কাছে আসুক, আমি তাদের কথা শুনব। দেশের এভিয়েশন খাত এগিয়ে নিতে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি।’
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

Aviation News