আবহাওয়া কি কখনও মানুষের নিয়ন্ত্রণে আসবে?

এই লেখাটি 140 বার পঠিত

কেমন হতো, যদি কোনো ঝড় শুরু হওয়ার আগেই আমরা তা থামিয়ে দিতে পারতাম। বিবিসি ফিউচার সে সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে।

সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ‘স্টার ট্রেক’ থেকে শুরু করে কার্টুন সিরিজ ‘দ্য জেটসন্স’ পর্যন্ত সবখানেই ভবিষ্যতে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জনে হিসেবে দেখা হয়েছে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারার বিষয়টিকে।

সর্বশেষ ‘জিওস্টোর্ম’ চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে- মানুষ এমন একটা উপগ্রহ তৈরি করেছে যা বড় ধরনের কোনো ঝড় তৈরি হওয়ার আগে তা থামিয়ে দিতে পারে।

সময়ের সাথে সাথে মানুষের এ ক্ষমতা অর্জনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। কিন্তু আসলেও কি তা সম্ভব?

আবহাওয়ার মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার যে চিন্তা এটা একেবারেই নতুন কিছু নয়। ১৯৬২ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সময়ে ‘স্টোর্মফিউরি প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ওই প্রকল্পের আওতায়- কোনো ঝড়ের একেবারে কেন্দ্রে কোনো উড়োজাহাজ উড়িয়ে ও সিলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে ঝড়টিকে দুর্বল করে ফেলার চেষ্টা করা হতো।

সিলভার আয়োডাইড একটি অজৈব উপাদান যা সাধারণভাবে অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মেঘের মধ্যে থাকা অতি শীতল পানি এটা বরফে পরিণত করতে পারে। যার ফলে ঝড়ের গঠনগত পরিবর্তন হয় ও সেটি দুর্বল হয়।

তবে ঝড়ে সব সময় অতি শীতল পানি থাকে না- এটা জানার পর থেকে এ পদ্ধতি এখন আর ব্যবহার করা হয় না।

এ ছাড়া আকারও একটা ইস্যু। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়াবিদ ক্রিস বেল বলছেন, কয়েক মাইল ব্যাপী যেসব ঝড় বিস্তৃত সেগুলো ঠেকাতে ছোট বিমানগুলো কোনো কাজে আসবে না।

এরপর যে পদ্ধতির দিকে বিজ্ঞানীদের চোখ গেল তা হলো লেজার। এ পদ্ধতিতে কৃত্রিমভাবে বজ্রপাত ঘটনোর একটা পরিকল্পনা করা হয়। আর তার ফলে ঝড়ের শক্তি কমে তা সাধারণ বৃষ্টিপাত ঘটায়।

এখানেও বড় সমস্যা হয়ে রইল আকার। এরপরই এল কৃত্রিম উপগ্রহের কথা। এটারও কিছু সমস্যা রয়েছে। এবং এর কর্মপদ্ধতির কারণে এটা বেশ ব্যয়বহুলও।

এ পদ্ধতি সম্পর্কে জানাশোনা রয়েছে এমন একজন বলছেন, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো ওই উপগ্রহের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং মহাকাশে যখন ওগুলো নেয়া হবে তখন যে সেগুলো ঠিক মতো কাজ করবে কি না, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া আবহাওয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে উপগ্রহ থেকে কোনো বস্তু মহাকাশে ছেড়ে দেয়ার যে পরিকল্পনা এ পদ্ধতিতে করা হয় সেখানে এমন ভয়ও করা হয় যে, এর ফলে হয়তো নিজের কক্ষপথ থেকে হারিয়ে যেতে পারে উপগ্রহটি। এর উপর ঝড়ের একেবারে কেন্দ্রস্থলে ওই বস্তুটিকে নিয়ে যাওয়াও খুব একটা সহজ কোনো কাজ হবে না।

উপগ্রহ থেকে লেজার ব্যবহার- এ ধারণা থেকে মনে হতে পারে এটা খুব সহজেই তাহলে সম্ভব। পৃথিবী থেকে লেজার পাঠাতে আলাদা কোনো কিছুর প্রয়োজন হবে না। পুরো প্রক্রিয়ায় যে শক্তি প্রয়োজন হবে তা সহজেই সোলার প্যানেল ব্যবহার করা পাওয়া যাবে।

তবে এখানে যেসব প্রশ্ন সামনে আসছে তার মধ্যে রয়েছে- বড় ধরনের সৌর ঝড়ের সময় কী হবে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণকারী স্যাটেলাইটের। সবচেয়ে বড় সৌরঝড়টি রেকর্ড করা হয় ১৮৫৯ সালে। সেরকম একটা সৌরঝড়ের মুখে পড়লে উপগ্রহটি হারিয়ে যাবে।

আর ‘জিওস্ট্রোম’ চলচ্চিত্র অনুযায়ী তো এর ফল আরও বিপজ্জনক হবে।

আর আবহাওয়ার পরিবর্তনের এ বিষয়টা আবার রাজনৈতিক দিকেও ঘুরে যেতে পারে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশন পপায়েতে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে ভিয়েতনামের সৈন্যদের মনোযোগ নষ্ট করেছিল।

ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো মাথায় রেখে রাজনৈতিক কারণে ও রাজনৈতিক বিরোধীর ক্ষতি করতে আবহওয়া নিয়ন্ত্রণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

আবহাওয়ার তিকে অন্যভাবে তাকালে দেখা যায় বেশ কিছু শর্তের উপর প্রভাব বিস্তার করে আমরা আসলে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করছি। সেটা মূলত করা হচ্ছে গ্রিন হাউজ গ্যাস ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। আর এর প্রভাব শুধু দূষিত এলাকাতেই নেই, বরং এর প্রভাব রয়েছে সারা বিশ্বে।

আর এ কারণেই আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও হতে হবে বৈশ্বিকভাবে। এরজন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রয়োজন হবে। কারণ আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে এক জায়গার ঝড়ের উপর প্রভাব বিস্তার করা হলে সেটি হয়তো অন্য কোথাও ঝড়েরে কারণ হতে পারে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, এখনও পর্যন্ত বলা যায়- আমরা যেভাবে চাই সেভাবে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটা প্রচুর ব্যয়বহুল ও এটি বাস্তবায়নে প্রচুর মানুষের প্রয়োজন হবে।

তবে স্বপ্ন দেখা বাদ দিচ্ছেন না ক্রিস বেল। তার ভাষায়, আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়- এমন প্রযুক্তি একদিন আমাদের থাকবে। তবে তার জন্য কয়েক হাজার বছর সময় লেগে যেতে পারে।

সূত্র: বিবিসি।

Aviation News