বিহঙ্গমানবদের গল্প

এই লেখাটি 126 বার পঠিত

বড় হয়ে কী হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা সবাই বলতাম, পাইলট। একটু বড় হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি, পাইলট কেন হতে চাই? আকাশের অপার রহস্য ছোঁব, তাই। আরও বড় হয়ে দেখেছি শুধু পাইলট কেন, বিমানের ক্রু বা বিমানবালা হওয়ার অদম্য আগ্রহ তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। শুধু কি আকাশছোঁয়া, পা রাখা যায় অজানা ভূগোলে! মহাভারতের একটি চরিত্রের নাম গরুড়। পড়েছি কৈশোরে। কশ্যপের স্ত্রী বিনতা স্বামীর বরে জন্ম দেন গরুড়কে। জন্ম নিয়েই গরুড় উড়াল দেয় আকাশে। আহ্‌, আমিও যদি উড়তে পারতাম। আমার মতো যারা কম বয়সে মহাভারত পড়েছেন বা ইকারুসের গল্প পড়েছেন, তাদের কার না ডানা লাগিয়ে উড়তে ইচ্ছে হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার নাম গারুদা, গরুড় চরিত্র থেকেই নেওয়া।
যতবার ধাতব গরুড়ের ডানায় ভর দিয়ে পাড়ি দিই সাগর, মহাসাগর, চেনা-অচেনা ভূখণ্ড, ততবারই ইচ্ছে হয় জেনে নিই বিহঙ্গমানবদের গল্প। এই যে তরুণ-তরুণী ক্রুরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে, এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে উড়ে বেড়াচ্ছে, কতটা সুখী ওরা? দুবাই থেকে নিউইয়র্ক, ১৩ ঘণ্টার এক লম্বা ভ্রমণ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিমান ইউরোপীয় কোম্পানি এয়ারবাসের এ৩৮০-৮০০ এখন ৪১ হাজার ফুট ওপরে। মেঘরাজ্যেরও ঢের ওপরে। পায়ের নিচে মেঘমালা দুপুরের রোদে ঝকঝক করছে। অ্যামিরাটসের এই বিশাল দ্বিতল বিমানটির নিচতলায় দুটি ফুড-কেবিন। আমি হাঁটতে হাঁটতে পেছনের কেবিনে চলে যাই। ছিপছিপে বেলজিয়ামের তরুণ ডিনের সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে তুলি। ২৮ বছরের এই তরুণ ক্রুর চোখেমুখে স্বপ্নের ফেনা। পাইলট ওকে হতেই হবে। এই স্বপ্নযুদ্ধে রক্তক্ষরণ কম হয়নি, হারিয়েছে প্রেমিকা বারবারাকে। ডিন অবশ্য একটুও দোষ দেয় না মেয়েটিকে। ওর সঙ্গে তো আমার দেখাই হতো না, কখনো দুই মাসে একবার, আবার কখনো তিন মাসে। এভাবে কি আর সম্পর্ক টেকে? তার মানে, তুমি এখন হাত-পা ঝাড়া? যখন যেখানে, তখন সেখানে? আরে না না। আমার গার্লফ্রেন্ড আছে, ক্লারা, পোলিশ। ও আমার চেয়ে দুই বছরের বড়। বেশ বোঝে আমাকে। ক্লারাও অ্যামিরাটসেই, এয়ার ক্রু। বাহ্‌, তাহলে তো খুবই ভালো। ধাতব পাখির দুই ডানা তোমরা দুজন, পূর্ণাঙ্গ উড়াল, আকাশ তো তোমাদেরই। কোথায় ক্লারা? এই ফ্লাইটেই আছে তো? তুমি তো দেখছি খুবই পোয়েটিক ও রোমান্টিকও। না, না, ও এই ফ্লাইটে নেই। আসলে কি, আমরা কখনো একসঙ্গে বিজনেস ট্রিপ করিনি। না, কখনোই না। অ্যামিরাটসের স্টাফদের সবার বেজস্টেশন দুবাই। কোম্পানি সবাইকে দুবাইয়ে অ্যাপার্টমেন্ট দিয়েছে। আমরা ফ্লাই করে যেখানেই যাই না কেন, ফিরতি ফ্লাইটে আবার দুবাইয়ে ফিরে আসি। সুতরাং, ওর সঙ্গে আমার সপ্তাহে অন্তত একবার দেখা হয়ই। হ্যাঁ, কখনো এমন হয় যে আমরা মাত্র দু-তিন ঘণ্টা একসঙ্গে কাটাতে পারি। তারপর হয় ওর, না হয় আমার ফ্লাইট থাকে।
আর সোশ্যাল লাইফ? এই ধরো, বন্ধুদের সঙ্গে গেট টুগেদার, হইহুল্লোড়। বাবা, মা, ভাইবোনের সঙ্গে দেখা, সময় কাটানো? একদমই হয় না?
হয়, যখন ছুটিতে থাকি। শোনো, ঘরমুখোদের জন্য এ পেশা নয়। যারা বোহেমিয়ান, ঘুরে বেড়াতে চায়, দেখতে চায় পৃথিবীকে, এটা তাদের জন্য। তুমি হয়তো জেনে অবাক হবে, আমাদের বেতন কিন্তু খুবই কম। মূল বেতন মাত্র এক হাজার ডলার। এর ওপর ফ্লাইং আওয়ার হিসাব করে পাই ফ্লাইট-অ্যালাউন্স। সেটাও খুব বেশি নয়। প্রতি ঘণ্টার জন্য মাত্র ৫০ দিরহাম। পনেরো ডলারের মতো। মাসে কেউ ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টার বেশি ফ্লাই করতে পারে না। সুতরাং, গড়ে আমরা মাসে আয় করি মাত্র ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ ডলার। তুমি তো নিউইয়র্কে থাকো, গ্রোসারিতে কাজ করেও অনেকে এর চেয়ে বেশি আয় করে। আর যারা ট্যাক্সি চালায়, তারা তো এর তিন গুণ আয় করে। একটা সুবিধা আছে। আমাদের তেমন কোনো খরচ নেই। যে দেশে যাই, সেখানকার থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব কোম্পানির। লম্বা ভ্রমণের পর দুই দিন বিশ্রামের জন্য পাই। এই দুই দিনে নতুন শহরটা উল্টে-পাল্টে দেখে নিতে পারি।
একা একটি নতুন শহরে?
সূত্রঃ প্রথম আলো

Aviation News