ফাঁসতে পারেন বিমানের নতুন এমডি ক্যাপ্টেন জামিল

এই লেখাটি 3003 বার পঠিত
captain

ফাঁসতে পারেন বিমানের নতুন এমডি ক্যাপ্টেন জামিল।

দুই দফায় ৫৮ পাইলট নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে সাবেক এমডি মোসাদ্দিক আহম্মেদের সঙ্গে এবার ফাঁসতে পারেন নতুন এমডি ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিলও। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুটি নিয়োগেই মোসাদ্দিক আহম্মেদের সঙ্গে মূল ভূমিকায় ছিলেন এই ফারহাত জামিল। তিনি ছিলেন নিয়োগ কমিটির প্রধান। পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন (ডিএফও) থাকার কারণে দুটি নিয়োগে তাকে কমিটির প্রধান করা হয়েছিল।
দুদকের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্টেও নতুন এমডি ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিলসহ বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সভাপতি ও একাধিক সদস্যের সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ মেলেছে। উল্লেখ্য, মঙ্গলবার বিমানের বোর্ড সভায় বিমান এমডি ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক আহম্মেদকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এরপর ক্যাপ্টেন ফারহাত আহম্মেদ জামিলকে নতুন এমডির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে পাইলট নিয়োগে ক্যাপ্টেন জামিল আহম্মেদ সাবেক এমডি মোসাদ্দিক আহম্মেদের ভাতিজাসহ কমপক্ষে ৩০-৩২ জন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে তাদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছেন। ৩২ শিক্ষার্থীর মধ্যে কমপক্ষে ৭ জন ছিলেন বিমান পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) নেতা ও সদস্যদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও পরিবারের সদস্য। ২ প্রার্থী ছিলেন সাবেক পাইলটের ছেলে।
এ প্রসঙ্গে বিমানের নতুন এমডি ও পাইলট নিয়োগ কমিটির প্রধান ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিল বলেন, তিনি মিডিয়ার কাছে কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। দুদককে তিনি সব তথ্য দেবেন। তারপরও তথ্য জানতে হলে বিমানের জনসংযোগ শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
জানা গেছে, এর আগে ১০ জনের পরিবর্তে ২৬ জন ক্যাডেট পাইলট নিয়োগে বড় ধরনের অনিয়মের বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। অভিযোগ ওই বছর ১০ জন ক্যাডেট পাইলট নিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছিল সংশ্লিষ্ট কমিটিতে। কিন্তু পরবর্তীকালে ক্যাপ্টেন জামিল আহম্মেদ কমিটির অন্য সদস্যদের না জানিয়ে গোপনে ফাইলে নোট লিখে ১০ জনের পরিবর্তে ২৬ জনকে নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করেন। আর তাতে সায় দেন সাবেক এমডি মোসাদ্দিক আহম্মেদ। বিমানের সাবেক এক প্রভাবশালী পাইলটের ছেলেকে নিয়োগ দেয়ার জন্য গোপনে ওই নোট ইস্যু করা হয়। ওই পাইলটের ছেলের সিরিয়াল নম্বর ছিল ২৬।
জামিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে পাইলটের আবেদন করা প্রার্থীদের কাগজপত্র চার সদস্যের কমিটির মাধ্যমে বাছাই করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি কাজটি করেছেন তিন সদস্যের কমিটির মাধ্যমে। কমিটির আহ্বায়ককে বিষয়টি জানানোই হয়নি। মৌখিক পরীক্ষার সময় কমিটির সদস্য চিফ অব ট্রেনিং উপস্থিত ছিলেন না। ডেপুটি চিফ অব ট্রেনিংকে দিয়ে মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়। চিফ অব ট্রেনিং এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।
জানা গেছে, বিমানের এমডি মোসাদ্দেক আহমেদ, পাইলট নিয়োগ কমিটির প্রধান ক্যাপ্টেন জামিলসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও প্রকল্পের দুর্নীতি খুঁজে বের করতে দুদকের সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলামকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এই টিমের সঙ্গে সহকারী পরিচালক মো. সালাহ উদ্দিনকেও সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সহকারী পরিচালক মো. সালাহ উদ্দিনকে আলাদাভাবে বিমানে পাইলট নিয়োগে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
পাইলট নিয়োগ কেলেঙ্কারি ছাড়াও জামিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক কম ফ্লাই করেও প্রতি মাসে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, বেতনের বাইরে শুক্র-শনিবার ফ্লাই করার নামে মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে ‘ডে-অফ ফি’ও উঠাচ্ছেন। প্রসঙ্গত, বিমানের আইন অনুযায়ী, বছরে একজন পাইলটকে কমপক্ষে ৭৫০ ঘণ্টা ফ্লাই করতে হয়। এর নিচে ফ্লাই করার অর্থ বসে বসে বেতন নেয়া।
জানা গেছে, আগে বিমানের পাইলটদের বেতন হতো ফ্লাইং আওয়ার অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টা অনুযায়ী। কিন্তু পাইলটরা আন্দোলন করে ২০০৮ সাল থেকে তাদের বেতন স্থায়ী করে নেন। অর্থাৎ ফ্লাই করুক আর না করুক, বিমানকে প্রত্যেক পাইলটের জন্য মাসিক বেতন দিতে হতো গড়ে ৭ লাখ টাকা। সম্প্রতি আবারও পাইলটদের বেতন ৩০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এখন একজন সিনিয়র পাইলট মাসে বেতন পাচ্ছেন ৯ লাখ টাকা। এর বাইরে মাসে ৭৫০ ঘণ্টার বেশি ফ্লাই করলে প্রতি ঘণ্টার জন্য অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা অ্যালাউন্স দিতে হচ্ছে।
এছাড়া মাসে ৮ দিন বাধ্যতামূলক ছুটি পান একজন পাইলট। কোনো কারণে ওই ছুটি কর্তন করা হলে প্রতিদিনের জন্য ১৪ হাজার টাকা ‘ডে অফ ফি’ দিতে হয়। অভিযোগ আছে, বিমানের পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন্স (ডিএফও) ক্যাপ্টেন জামিল আহমেদ ২০১৮ সালে ফ্লাই করেছেন মাত্র ২৪২ ঘণ্টা। অথচ তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৯ লাখ টাকার (ট্যাক্স ছাড়া) পাশাপাশি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ‘ডে অফ ফি’ উঠাচ্ছেন। এই ২৪২ ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশই ছিল ভিআইপি বা ভিভিআইপি ফ্লাইট। অথচ ক্যাপ্টেন জামিল বিমানের একজন উচ্চপর্যায়ের সিমুলেটর ইন্সট্রাক্টর। সিডিউল ফ্লাইটের পাশাপাশি তিনি সিমুলেটর ট্রেনিংয়েও ফ্লাই করেন না। ফলে মোটা অঙ্কের টাকায় বিদেশি ইন্সট্রাক্টর নিয়োগ দিতে তার ফ্লাইগুলো করাতে হচ্ছে।
এছাড়া ক্যাপ্টেন জামিলের ফ্লাইগুলো করানোর জন্য প্রতি মাসে অন্য একজন পাইলটকে ৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে। বিষয়টি স্বীকার করে ক্যাপ্টেন জামিল আহমেদ কিছুদিন আগে বলেছেন, অন্য পাইলটদের সম্পর্কে তিনি কিছু বলবেন না। যেহেতু তিনি ম্যানেজমেন্টে আছেন সেজন্য তার ফ্লাইট না করলেও চলে। অর্থাৎ পলিসিগত কারণে তিনি ডিউটি করতে পারছেন না।
এদিকে দুদকের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত টিম বিমানের কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জের ৭২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করছে। বিমানের একটি সূত্র বলছে, ১০ বছরে ওই খাত থেকে ৭২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। কিন্তু সব তথ্য না থাকায় মাত্র ৪১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত রিপোর্ট চূড়ান্ত করা হয়। দুদক সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনার সঙ্গে বিমানের কার্গো শাখার পাশাপাশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং বিভাগ, ইন্টারনাল অডিট শাখাও জড়িত।
দুদক বলছে, ২০০৮ সাল থেকে কার্গো শাখার নন-সিডিউল ফ্লাইটের চার্জ আদায় করা হচ্ছে না জেনেও বিমানের ইন্টারনাল অডিট গত ১০ বছরে কখনও তা খাতা-কলমে দেখায়নি। অভিযোগ আছে, মোটা অঙ্কের টাকা মাসোয়ারা নিয়েই বছরের পর বছর নিশ্চুপ ছিল এই শাখা। ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মার্কেটিং বিভাগের পক্ষ থেকে যখন কার্গো শাখার নন-সিডিউল ফ্লাইটের ওপর কেজিপ্রতি ০.১০৬৮ সেন্ট চার্জ আরোপ করে তখনই টনক নড়ে অডিট শাখার। দুদকের সংশ্লিষ্টদের ধারণা হয়তো মাসোয়ারা বন্ধ হওয়ায় ১০ বছর পর বিষয়টি অডিটের নজরে এসেছে নতুবা তাদের অজ্ঞতার কারণে এটি খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি।
অপরদিকে কার্গো নন-সিডিউল ফ্রেইটার অপারেটরের কাছ থেকে কার্গো বা মেইলি হ্যান্ডেলিং চার্জ আদায়ের বিষয়ে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং ইউনিট থেকে কোনো ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়নি গত ১০ বছরে। ৭২ কোটি টাকার অডিট আপত্তি প্রসঙ্গে বিভাগের কর্মকর্তা শাহরিয়ার খান বিমানকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত বিমানের সঙ্গে কখনও কোনো নন-সিডিউল ফ্রেইটারের কার্গো বা মেইল হ্যান্ডেলিং চার্জ নেয়ার বিধান ছিল না। আগে যে কোনো কার্গো ফ্রেইটার দেশের যে কোনো বিমানবন্দরে অবতরণ করলে তাদের কাছ থেকে ৯ হাজার মার্কিন ডলার আদায় করা হতো। ওই ৯ হাজার ডলারের মধ্যে কার্গো হ্যান্ডেলিং চার্জ অন্তর্ভুক্ত ছিল বিধায় কখনও কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।
এছাড়া নন-হ্যান্ডলিং কার্গো শাখার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কে দুদকের চিঠিতে সরকারি অডিট রিপোর্টের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সার্কুলার না থাকায় সিডিউলবহির্ভূতভাবে বিমান থেকে কোনো টাকা আদায় করা সম্ভব হয়নি।

Aviation News