পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক চিঠি পোস্টবক্স

এই লেখাটি 132 বার পঠিত

বিষয়টা বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘ডিসপারেটলি সিকিং’ টাইপ গ্রুপের মতো। যার যা চাই পোস্ট করুন, আর যার মনে চাইবে হেল্প করবে। তাই বলে ভালোবাসা? সোজা করে বলি। একটা গাছের গর্ত। সেখানে মনের মানুষকে উদ্দেশ করে লিখে আসলেন চিঠি। আর সেই চিঠি পড়ে যার পছন্দ হল সেই জবাব দিল। শুরু হল প্রেম। তারপর বিয়ে।

ভাবছেন সিনেমার গল্প হয়তো। কিন্তু না, বাস্তবেই ঘটেছে এমনটা। জার্মানির ইউটিন শহরের ডোডাওয়ের বনের একটি ওক গাছের কাণ্ডকে বলা হচ্ছে পৃথিবী সবচে ‘রোমান্টিক পোস্ট বক্স’।

ওক গাছটির বয়স প্রায় ৫০০ বছর। পরিচিত ‘বর ওক গাছ’ নামে। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এই গাছটি ১০০টিরও বেশি বিবাহের সাক্ষী হয়ে আছে। বর্তমানে সারাবিশ্ব থেকে প্রেমিক প্রেমিকারা এই গাছের ঠিকানায় চিঠি লিখে এই আশায় যেন তারা তাদের ভালোবাসার মানুষটিকে খুঁজে পায়।

এই পোস্টবক্সে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের চিঠি আসে বলে জানিয়েছেন ৭২ বছর বয়সী কার্ল-হেইঞ্জ মার্টেনস। মার্টেনস ১৯৮৪ সাল থেকে শুরু করে ২০ বছর ধরে এই ওক গাছের পোস্ট মাস্টারের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ইন্টারনেটে মানুষকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে ও তার সব সত্যতা যাচাই-বাছাই করে তারপর বিয়ে ঠিক করে। কিন্তু ওক গাছের পোস্টবক্সটি সৌভাগ্যের মতই কাকতালীয় ঘটনা মাত্র। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক মানুষই এই গাছ সম্পর্কে জানে, কিন্তু ১২৮ বছর আগেও এটি ছিল শুধুমাত্র দু’জন প্রেমিক-প্রেমিকার গোপন কথা জানাবার জায়গা।’

মার্টেনস সম্প্রতি তার এই কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। তারপরও তিনি ছবি, চিঠি এবং সংবাদপত্রের ক্লিপিংস দিয়ে ভর্তি একটি স্ক্রুপবই সবসময় সঙ্গে রাখেন। এই দুই যুগের কর্মজীবনে মার্টিনস ছয়টি মহাদেশ থেকে আসা চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন চিঠির প্রিয়জনদের কাছে। অনেকসময় তিনি অনেক চিঠির ভাষা বুঝতেও পারতেন না।

১৮৯০ সালে মিন্না নামের সাধারণ এক গ্রামের মেয়ে উইলহেম নামের এক তরুণ চকলেট বিক্রেতার প্রেমে পড়েন। কিন্তু মিন্নার বাবা তাকে উইলহেমের সাথে মেলামেশা করতে নিষেধ করে দেন। তারা নিজেরা মেলামেশা বন্ধ করলেও প্রতিনিয়তই এই ওক গাছের একটি গর্তে কাগজে লিখে তাদের গোপন বার্তাগুলো আদান-প্রদান শুরু করে। এক বছর পর মিন্নার বাবা তাদেরকে বিয়ে করার জন্য অনুমতি দেয় এবং ১৮৯১ সালের ২ জুন এই ওক গাছের নিচেই তাদের বিয়ে হয়। এই গাছের নিচেই ১০টি বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে মার্টেনস জানান।

মিন্না-উইলহেমের জুটির গল্প রূপকথার মত পুরো জার্মানিতেই ছড়িয়ে পড়ে এবং যারা তাদের রোমান্টিক সঙ্গী নেই বলে হতাশাগ্রস্থ ছিলেন তারাও এই ওক গাছের ঠিকানায় চিঠি পাঠানো শুরু করেন। ১৯২৭ সালে এই গাছের ঠিকানায় এত চিঠি এসেছিল যে জার্মান ডাকঘর বিভাগ ‘ডুয়েটসে পোস্ট’ এই ওকগাছের জন্য নির্দিষ্ট পোস্টকোড ও পোস্টম্যান রাখতে বাধ্য হয়েছিল। এই গাছে একটি মইও ভেড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল যেন সকলেই এই চিঠি পড়তে পারে এবং চিঠির জবাব দিতে পারে।

আরও একটি কাহিনীর বর্ণনা দেন মার্টেনস। ১৯৫৮ সালে পিটার পাম্প নামের একজন তরুণ জার্মান সৈনিক এই গাছের পোস্টবক্সে আসেন। অনেকগুলো চিঠির মধ্যে একটি খোলেন যেটিতে শুধু প্রেরকের নাম ও ঠিকানা লেখা ছিল। তিনি চিঠির উত্তর পাঠান ‘সম্মানিত মিস মারিতা’ লিখে এবং তার সাথে দেখা করতে চান। কিন্তু মিস মারিতা অন্য সকল মেয়ের মতই ভীতু থাকার কারণে দেখা করতে চায়নি। দীর্ঘ এক বছর ধরে এই ওক গাছের কাণ্ডেই চিঠি আদান প্রদান করে দুজন। অবশেষে এক বছর পর তারা দেখা করে এবং ১৯৬১ সালে দু’জনে বিয়ে করেন। এই বছর তারা তাদের ৫৭তম বিবাহ বার্ষিকী পালন করছেন।

মার্টেনস ব্যাখ্যা করেন, এই গাছের শুধু একটাই নিয়ম ছিল। আপনি যে চিঠিটি খুলবেন সেটির উত্তর যদি আপনি না দিতে চান তাহলে তাহলে সেটির মুখ আবার বন্ধ করে রাখুন যেন পরবর্তী কেউ সেটি খুঁজে পায়। কারণ প্রতিটি মানুষই তার নিজের পছন্দের মত করে প্রিয়জনকে বেছে নিতে পছন্দ করে।

জার্মানির ডাকঘর ডুয়েটসে পোস্টের মুখপাত্র মার্টিন গ্রুন্ডলার বলেন, ‘প্রতিবছর প্রায় এক হাজার চিঠি এই গাছের ঠিকানায় এসে থাকে। গ্রীষ্মকালেই বেশিরভাগ চিঠি আসে। আমার মনে হয় এই সময়ই বেশিরভাগ মানুষ প্রেমে পড়তে চায়।’

একটি প্রচলিত কথা আছে এই ওক গাছ নিয়ে। কোনো নারী যদি মন থেকে কাউকে চায় এবং পূর্ণিমার রাতে কোনো ধরনের কথা না বলে শুধু তার প্রিয়তমর কথা মনে করে এই গাছের গুড়ির চারপাশ দিয়ে তিনবার হাঁটাহাঁটি করে তাহলে এক বছরের মধ্যেই তার প্রিয়তমর সাথে তার বিয়ে হবে।

২০০৯ সালে দীর্ঘ একশ বছর ধরে চিঠির মাধ্যমে প্রেমিক-প্রেমিকাকে কাছাকাছি নিয়ে আসার পরে এই ‘বর ওক গাছ’কেই ২০০ বছরের পুরানো ডুসেলডফের কাছাকাছি একটি কাঁঠবাদাম গাছের সাথে প্রতীকী বিয়ে দেয়া হয়। যদিও গাছটি ৫০৩ কিলোমিটার দূরে ছিল ওক গাছের চেয়ে। বেশি বয়স হওয়ার কারণে কাঁঠবাদাম গাছটিকে কেঁটে ফেলার আগে তারা মাত্র ছয় বছর একসাথে ছিল। বিগত ২০ বছরে শুধুমাত্র ১০ দিন কেউ এই ওক গাছের ঠিকানায় কেউ চিঠি লিখেনি।

Aviation News