বগুড়ায় ১০০ কেজি ওজনের বাঘাইড়, দাম লাখ টাকা

এই লেখাটি 164 বার পঠিত

বগুড়ায় হয়ে গেল অলিখিত বড় মাছ কেনা বেচার প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় মাছ বিক্রেতা এবং মেলা এলাকার জামাইরা বড় মাছ কেনার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। এ প্রতিযোগিতায় হার জিত না থাকলেও ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বুধবার বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় দুইশত বছরের ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলায় এ মাছের প্রতিযোগিতা হয় উৎসবমুখর পরিবেশে। এবারের মেলায় ১০০ কেজির বাঘাইড় মাছ থেকে ৩৬ কেজি ওজনের সিলভার কার্প আর ২০ কেজি ওজনের বোয়াল, কাতলা, রুই মাছের ছিল ছড়াছড়ি। ১০০ কেজি ওজনের মাছের দাম হাঁকা হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। মাছের পাশাপাশি মেলায় মাছ আকৃতির ১০ কেজি ওজনের মিষ্টি, বাঁশ ও কাঠের ফার্নিচার কেনাকাটায় মুখিয়ে ছিল প্রায় ৩০ গ্রামের মানুষ। মেলায় একদিনেই কয়েক কোটি টাকার কেনাবেচা হয়ে থাকে।

জানা যায়, বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নে ইছামতি নদীর শাখা (খাল) সংলগ্ন পোড়াদহ নামক স্থানে বসে এই মেলা। প্রায় দুইশত বছর আগে বগুড়া-চন্দনবাইশা সড়ক সংলগ্ন পোড়াদহ খালের পাড়ে এক বিশাল বটবৃক্ষ তলে আয়োজন করা হতো সন্ন্যাসী পূজার। প্রতি বছরের মাঘ মাসের শেষ বুধবার আয়োজিত এই মেলা কালের বিবর্তনে হয়ে ওঠে পূর্ব বগুড়াবাসীর মিলনমেলা। পোড়াদহ নামক স্থানে হয় বলে এ মেলার নাম হয়ে যায় পোড়াদহ মেলা। সন্ন্যাসীর মেলা দিয়ে শুরু হয়ে পোড়াদহ মেলা নাম ধারণ করে এবং সর্বশেষে এসে কালের বিবর্তনে এখন বলা হয় মাছের মেলা। স্থানীয়রা বলেন, জামাই মেয়ে মেলা। মেলাকে ঘিরে আশপাশে প্রায় ৩০ গ্রামের মানুষ মেয়ে ও মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। তাদের সাথে নিমন্ত্রণ দিয়ে থাকে স্বজনদের। এ কারণে স্থানীয়রা এ মেলাকে জামাই মেলা বলে থাকে। নদী তীরবর্তী স্থানে এই মেলায় দিন দিন নানা প্রজাতির মাছের আমদানি হতে থাকে। মেলা থেকে বড় মাছ কিনে থাকে গ্রামের জামাইরা। কোন কোন জামাই কত বড় মাছ কিনেছে তার একটি লোকমুখে প্রতিযোগিতা চলে আসে। আবার মেলায় কোন জেলে কত বড় মাছ তুলেছে তা নিয়ে মেলা অঙ্গনে পড়ে যায় শোরগোল।

বগুড়ার গাবতলী উপজেলা সদরের বাসিন্দা আমিনুর রহমান জানান, মেলাকে ঘিরে প্রায় ৩০ গ্রামের মানুষ স্বজনদের নিমন্ত্রণ করে থাকে। বিশেষ করে মেয়ে ও মেয়ে জামাইকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি চলে আনন্দ উৎসব। গ্রামের মানুষের কাছে ঈদের পর এটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব।

গাবতলী উপজেলার মড়িয়া গ্রামের মাছ বিক্রেতা জলিলুর রহমান জানান, এবারের মেলায় তিনি ১৮ কেজি ওজনের বোয়াল মাছ নিয়ে এসেছেন। মাছটির দাম হাঁকা হয়েছে ২০০০ টাকা কেজি। তিনি বলেন, মেলায় বিভিন্ন সাইজের মাছ রয়েছে। বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০০ টাকা কেজি পর্যন্ত।

মেলার জন্য ১০ কেজি ওজনের মাছ আকৃতির মিষ্টি তৈরী করেছেন ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ। মহিষাবান এলাকার ব্যবসায়ী লতিফের দোকানে এ মিষ্টির দাম হাঁকা হয়েছে ৪ হাজার টাকায়। এছাড়া এক কেজি, দুই কেজি, ৩ কেজি, ৪ কেজি ওজনের মিষ্টিও মেলায় পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন নামে। ২শ মন মিষ্টি রয়েছে এ দোকানে। এ মেলায় মাছ, মিষ্টি, ফর্নিচার, বড়ই, পান-সুপারী, তৈজসপত্র, খেলনা থাকলেও কালক্রমে মাছের জন্য বিখ্যাত হয়ে ‍উঠছে। মেলায় নাগরদোলা, চরকি, সার্কাসসহ শিশুদের জন্য অন্যান্য খেলা চলছে।

এবারের মেলায় শত কেজি ওজনের বাঘাইড় মাছের দাম ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে কেউ এককভাবে মাছটি ক্রয় না করায় কেটে বিক্রি করা হয়। মাছটির প্রতি কেজি বিক্রি করা হয় ১২শত টাকা কেজি।

বুধবার সকাল ১০টার দিকে ৮০ কেজি ওজনের বাঘাইড় মাছ কেটে বিক্রি শুরু হয়। মাছ ও মিষ্টির জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠা এই মেলায় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের পদচারনায় মুখর হয়ে উঠে।

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রানীরপাড়ার শফিকুল ইসলামও নিয়ে এসেছেন ১০০ কেজি ও ৮০ কেজি ওজনের দুটি বাঘাইড় মাছ। তিনি জানান, মাছ দুটি প্রায় ১৫ দিন আগে রাজশাহীর জেলেরা পদ্মা নদী থেকে জাল দিয়ে ধরার পর দড়ি দিয়ে বিশেষ কায়দায় বেঁধে রেখেছিল। সোমবার নদী থেকে তুলে সেটি বিক্রির জন্য নিয়ে আসা হয়। তিনি মাছটি বিকালে কেটে ৮০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন। তিনি আরো জানান, বিভিন্ন স্থানের মাছ চাষীরা মেলাকে ঘিরে মাছ চাষ করে থাকে। বড় মাছ বিক্রির জন্যই তারা এ মাছ চাষ করে মেলায় নিয়ে আসে। তাতে সবার চেয়ে বড় মাছ মেলায় আসায় নাম ডাক ছড়ে পড়ে। তিনি এবারের মেলায় ১১ লাখ টাকার মাছ নিয়ে এসেছেন।

স্থানীয় মাছের ব্যবসায়ী গাবতলীর চকমড়িয়া গ্রামের মো. নান্নু, জলিল হোসেন ও মোসতাক জানান, যমুনা নদীর ৮০ কেজি ওজনের বাঘাইড় কেটে বিক্রি করছেন ১২শ টাকা কেজি দরে। আর ১শ কেজি ওজনের বিশাল আকৃতির মাছটি বিক্রি করেন ১২শ ৫০ টাকা কেজিতে। এছাড়া এই মেলায় ১৭ কেজি ওজনের বোয়াল মাছের দাম হাঁকানো হয়েছে প্রতি কেজি ১৬শ টাকা, ১৫ থেকে ১৮ কেজি ওজনের কাতলা মাছ ২২শ টাকা কেজি, ৮ থেকে ১০ কেজি ওজনের কাতলা মাছ ১২শ টাকা, ১০ কেজির উপরে আইড় মাছ ১২ শ থেকে ১৫শ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ৮ থেকে ১০ কেজি ওজনের রুই, কাতলা, সিলভার কাপ, মিরর কাপ, পাঙ্গাস, ব্রিগেড অন্যান্য জাতের মাছ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা কেজির মধ্যে।

মেলায় মাছ ক্রয় করতে আসা বগুড়া শহরের উপ শহরের মাহাবুব টুটুল জানান, ৮ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ প্রতি কেজি ৯০০শ টাকা দরে ক্রয় করেছেন। মেলাটি ঐতিহ্যবাহি। এ মেলার অনেক নাম ডাক শুনে শহর থেকে মাছ কিনতে গিয়েছেন।

মেলাকে ঘিরেই শুধু মাছ বিক্রি হচ্ছে না। এই মেলার দিনে বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারেও ১০০ কেজি ওজনের চারটি বাঘাইড় মাছ নিয়ে আসা হয়। মাছের দোকানগুলো বিভিন্ন রঙের কাগজ দিয়ে সাজানো হয়। দুপুরের পর ১০০ কেজি ওজনের মাছটি প্রতি কেজি ৮০০ টাকা করে বিক্রি হয়। মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, মেলায় স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে প্রায় ১ কোটি টাকার মাছ বাজারে নেয়া হয়েছে। এই মাছ এখানেই বিক্রি হবে।

বগুড়া শহরের মারতিনগরের আলমগীর হোসেন জানান, পোড়াদহ মেলায় স্থান না পাওয়ার কারণে ফতেহ আলী বাজারে তারা মাছ বিক্রি শুরু করেছেন। মেলায় ১০০ কেজির পাশাপাশি এই বাজারেও বিভিন্ন ধরনের ও সাইজের মাছ বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় সমাজসেবক লুত্ফর রহমান সরকার স্বপন জানান, হাজার হাজার মানুষের পদচারণা হয়ে থাকে এ মেলায়। তবে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির কারনে এবার স্বল্প পরিসরে মেলা বসেছে। তারপরেও উৎসব থেমে নেই। জামাই মেয়েসহ আত্মীয় স্বজনদের পদচারনায় মুখর হয়ে উঠেছে গোটা এলাকা।

বগুড়ার গাবতলী মডেল থানার ওসি খায়রুল বাসার বলেন, পোড়াদহ মেলাটি সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোন প্রকার জুয়া কিংবা অশ্লীল নাচ-গান করার চেষ্টা হলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তিনি জানান, বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি জেলা থেকেও সাধারণ মানুষ মেলায় এসেছেন। তাদেরও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে।

বণিকবার্তা থেকে সংগৃহীত

Aviation News