বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অর্ধেক জনবল বাদ দিয়ে অর্গানোগ্রাম তৈরির চেষ্টা

এই লেখাটি 482 বার পঠিত

বিমানের অর্ধেক জনবলকে বাদ দিয়ে বিতর্কিত অর্গানোগ্রাম তৈরি করার চেষ্টা চলছে। বছরের পর বছর ধরে কাটছাট করেও একটি যুগোপযোগী অর্গানোগ্রাম করতে পারছে না বিমান। এ অবস্থায় যখন অর্গানোগ্রামের মোটামুটি একটা রুপরেখা দাঁড় করানো হয়েছে-সেখানে ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের (পে-গ্রুপ-১) বাদ দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন দুজন প্রভাবশালী সদস্য। তারা চাচ্ছেন, বিমানে দৈনিক ভিত্তিক (ক্যাজুয়াল) শ্রমিকদের মূল জনবল কাঠামোর বাইরে রেখে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আউটসোর্সিং করতে। এমন সিদ্ধান্তে বিমানের প্রায় আড়াই হাজার দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিকদের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। বিমানকর্মীদের মতে- এমনিতেই বিমানের সেবার মান যখন তলানিতে, তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত হবে চরম হঠকারী ও আত্মঘাতী। বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, অর্গানোগ্রাম করতে এতদিন কেন দেরি হয়েছে, সেটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে আমি দায়িত্ব নেয়ার পর জানতে চেয়েছিলাম বিষয়টি নিয়ে, তখন বিমান থেকে আমাকে আশ্বস্ত করেছে খুব শীঘ্রই একটা রিপোর্ট তৈরি করে তারা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।

এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন এম মোসাদ্দিক আহমেদ বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, পে গ্রুপ-১ রাখার বিষয়ে আমরা অত্যন্ত পজেটিভ। এদের না রাখা বা বাদ দেয়ার কোন বিষয়ে কোন সিদ্বান্ত হয়নি। নতুন অর্গানোগ্রামে অবশ্যই তারা থাকবে। কিন্তু কত পার্সেন্ট স্থায়ী থাকবে কত পার্সেন্ট আউট সোর্সিং হবে সেটা নিয়ে কথা বার্তা চলছে।

এদিকে যাত্রীসেবার মূল ভূমিকা পালনকারী যে শ্রমিকরা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করছে, তা বিমানের মোট জনবলের প্রায় অর্ধেক। মোট সাড়ে চার হাজার জনবলের ২৪শ’ শ্রমিক কাজ করছে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে। বিমানের সার্বিক কর্মকান্ড নির্ভর করছে এসব শ্রমিকের কাজ করা না করার ওপর। প্রতিটি শিফটে যাত্রীর বোর্ডিং কার্ড দেয়া, লোড আনলোড, ব্যাগেজ ডেলিভারি, ইকুইপমেন্ট সার্ভিস, রক্ষণাবেক্ষণ, রান্নাবান্না, প্রকৌশল ও কাস্টমার সার্ভিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। হাজার কোটি টাকা দামের একটি উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ থেকে লোড আনলোডের কাজও করানো হচ্ছে এদের দিয়ে। মোট জনবলের ডিউটি যদি আনুপাতিক হারে বিভাজন করা হয়, তাহলে দেখা যায় গোটা এয়ারলাইন্সের পরিচালনা মূল চালিকাশক্তি এসব ক্যাজুয়াল শ্রমিক। প্রতি চারটি শিফটেই এসব শ্রমিক ডিউটি করছে। এরা যদি এক যোগে এক ঘণ্টা কর্ম-বিরতি ঘোষণা করে কিংবা কাজ থেকে স্বেচ্ছায় কোন অজুহাতে বিরত থাকে তাহলেই বিমান বসে যাবার উপক্রম হবে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারলেও বিমান কর্তৃপক্ষ তাদের ন্যূনতম অধিকারের প্রতি এতটুকু সহানুভূতিশীল নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান পর্ষদের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল নাইম হাসান বলেন, এ নিয়ে এখনও কোন সিদ্বান্ত হয়নি। অর্গানোগ্রাম নিয়ে দুটো কমিটি কাজ করছে। একটা কমিটি দেখছে ডিজিএম এবং তদুর্ধ কর্মকর্তাদের কাঠামো কি হবে সেটা। অন্যটি ক্যাজুয়াল থেকে ডিজিএম পর্যন্ত দেখার জন্য। মোট জনবলের সংখ্যাটা ৭ হাজারকে ঘিরেই পক্ষে বিপক্ষে মতামত আসছে। তবে এখন আর সময় লাগবে না।

অপর একজন সদস্য জানান, অর্গানোগ্রামে ডিজিএম থেকে এমডি পর্যন্ত সংখ্যা নিয়ে মোটামুটি একটা ঐক্যমত হলেও মতৈক্য দেখা দিয়েছে মূলত ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের নিয়েই। বিমানে এদের অপরিহার্যতার বিষয়টি সব সদস্য স্বীকার করলেও তাদের চাকরিটার ধরণ কি হবে সেটা নিয়েই কেউ একমত হতে পারছেন না। এ সংক্রান্ত সাব-কমিটির দুজন সদস্য প্রভাবশালী সদস্য চাচ্ছেন ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের পদ থাকবে পে গ্রুপ -১ হিসেবে। কিন্তু তাদের চাকরি স্থায়ী করা হবে না। তাদের আউট সোর্সিং করে কাজ করাতে হবে।

একজন সদস্য জানান, পে গ্রুপ -১ আউটসোসিং করা হবে নাকি স্থায়ী করা হবে তার পক্ষে জোরালো মত দেয়ার জন্য এর দায়ভার বিমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোন সাহসী ভূমিকা নিতে পারছে না। কেননা বিমানে রয়েছে- সরকার সমর্থিত শ্রমিক লীগের নির্বাচিত সিবিএ। এ সংগঠন এতটা সুসংহত ও বলিষ্ঠ যে কোন পরিস্থিতিতে আন্দোলনের ডাক দেয়া মাত্রই মুহূর্তেই বিমান অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বছর চারেক আগে এই সিবিএ-এর ডাকা ধর্মঘটে বিমান অচল হওয়ার যে তিক্ত অভিজ্ঞতার নজির রয়েছে- সেটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে গত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ওভারটাইম না করার মতো একটি সাধারণ কর্মসূচী ঘোষণা দেন সিবিএ সভাপতি মশিকুর রহমান। তিনি ৩১ জানুয়ারির পর থেকে ডেটলাইন দিয়ে ওভারটাইম না করার ঘোষণা দেয়ায় বিমান কর্তৃপক্ষ তাদের দুটো দাবি তাৎক্ষনিক মেনে নেয়। তবে আগামী ৭ মার্চের মধ্যে চাকরি স্থায়ী করার বাকি মূল দাবি মেনে নেয়ার আল্টিমেটাম দেয় সিবিএ। এ অবস্থায় বিমান সিবিএ এখন আরও শক্ত ও দৃঢ়তার সঙ্গেই ৭ মার্চের দিনক্ষণ গুণছে। এর আগে অর্গানোগ্রাম হোক বা না হোক ক্যাজুয়ালদের চাকরি স্থায়ী করার বিষয়টি বিমানকেই নিষ্পত্তি করতে হবে বলে জানিয়েছেন মশিকুর রহমান। এ দিকে বিমান কর্তৃপক্ষ ৭ মার্চের আল্টিমেটাম কিভাবে মোকাবেলা করবে তা নিয়ে আইনজ্ঞের মতামত নিয়েছে। কেননা বিমানে বর্তমানে চলছে জরুরী সার্ভিস। এ অবস্থায় তাদের ডাকা এই কর্মসূচী কতটা বৈধ সেটা খতিয়ে দেখছে। ইতোমধ্যে বিমানের লিগ্যাল শাখাকে এ বিষয়ে সিবিএ কে নোটিস করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিবিএ সভাপতি মশিকুর রহমান বলেন, শ্রম আইন মেনেই কর্মসূচী দেয়া হয়েছে। শ্রম আইনের (২০০৬) এর ১০০ ধারা অনুযায়ী যে কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ওভারটাইম করাতে বাধ্য করে না। এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে শ্রমিকের ইচ্ছার ওপর। সে যদি ৮ ঘণ্টা কাজ করার পর আর কাজ করতে না চায় তাহলে তাকে কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না। জরুরী সার্ভিসের আইনেও এমন বাধ্যবাধকতা নেই- যেটার দোহাই দিয়ে বিমান এই কর্মসূচীকে অবৈধ বলে অভিহিত করার বৃথা চেষ্টা করছে।

জরুরী সার্ভিসের সময় কিভাবে এ কর্মসূচী চলবে জানতে চাইলে মশিকুর বলেন, জরুরী সার্ভিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে-কোন কর্মবিরতি করা যাবে না এবং কাউকে কর্মবিরত রাখাও যাবে না। আমরা তো সেটা করছি না। বিমানে জরুরী সার্ভিস চলাবস্থায় কোন ধরনের ধর্মঘট বা অনশনের মতো কর্মসূচীতে যাবে না সিবিএ। কাউকে জিম্মিও করবে না। শুধু ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের দিয়ে বাধ্যতামূলক যেভাবে প্রতিদিন ওভারটাইম করানো হচ্ছে-সেটা শ্রমিকরা যদি স্বেচ্ছায় না করে- তাহলে কি তাদের ফোর্স করা যাবে?

সূত্রঃ জনকণ্ঠ

Aviation News