অর্গানোগ্রাম ছাড়াই চলছে বিমান

এই লেখাটি 421 বার পঠিত

দশ বছর ধরে অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) ছাড়াই চলছে বিমান। কর্পোরেশন থেকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি (পিএলসি) করা হলেও এখনও তৈরি করা যায়নি যুগোপযোগী একটি অর্র্গানোগ্রাম। গত দশ বছর ধরে অর্গানোগ্রাম তৈরির বৈঠক বাবদ আপ্যায়ন ও সম্মানী বাবদ গচ্চা গেছে কোটি টাকা। বৈঠকের নামে বোর্ড মেম্বাররা সেলামি ও বিএফসিসি থেকে বিনামূল্যে খাবার খেয়ে যে টাকা অপচয় করেছেন ওই টাকা দিয়ে বিদেশী নামী দামী কোম্পানি দিয়ে তিন মাসেই একটি বিজ্ঞান সম্মত অর্গানোগ্রাম তৈরি করা যেতো। এখনও যে অবস্থায় রয়েছে তাতে খুব শ্রীঘই যে এটা তৈরি করা সম্ভব হবে তেমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। যদিও বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন, অর্গানোগ্রামের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন আর এত সময় লাগবে না। অন্যদিকে দশ বছরেও অর্গানোগ্রাম না হওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে এভিয়েশান বিশেষজ্ঞ আশীষ রায় চৌধুরি বলেছেন, বিমানের বর্তমান পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা আছেন- তারা যে কতটা অথর্ব ও অকর্মা এই একটি ইস্যুর দিকে তাকালেই অনুধাবন করা যায়। তারা নিজেরাই এভিয়েশান সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান রাখেন না। এটাই মূল কারণ অর্গানোগ্রাম সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে না পারার। এ ধরনের লোকজনের কাছ এর চেয়ে ভাল কিছু প্রত্যাশা করাটাও বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। তারা যদি এয়ারলাইন্স সম্পর্কে প্রফেশনাল হতেন, দক্ষ হতেন, তাহলে তারা ছয় থেকে এক বছরের মধ্যে একটা অর্গানোগ্রাম তৈরি করতে সক্ষম হতেন। যে টাকা শুধু বোর্ড সাব-কমিটির আপ্যায়ন ও সম্মানী ভাতায় ব্যয় হয়েছে- সেটা দিয়ে অনেক আগেই যুগোপযোগী একটি অর্গানোগ্রাম তৈরি করা সম্ভব ছিল।
জানতে চাইলে বিমান চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল ইনামুল বারী বলেন, আগামী জুনের আগেই অর্গানোগ্রাম চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়ে যাবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, হুট করে কিছু করা যায় না। তবে এটি আরও আগে হওয়াই উচিত ছিল।
বিমান সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির প্রধান ও সাবেক মন্ত্রী ফারুক খান বলেন, এটা নিঃসন্দেহে বিমানের ব্যর্থতা। এত বছর ধরে অর্গানোগ্রাম ছাড়া বিমানের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ও জাতীয় এয়ারলাইন্স চলছে কিভাবে সেটাই তো আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। এ বিষয়টি সংসদীয় কমিটির কাছেও কেউ কোন অভিযোগ করেনি। করলে ব্যবস্থা নিতাম। এখন যদি মিডিয়ায় প্রকাশ হয় অবশ্যই আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখব।
উল্লেখ্য ২০০৭ সালে বিমান কর্পোরেশন করার আগ পর্যন্ত অর্গানোগ্রামে ছিল ৬৮০০ জন। যদিও তার বিপরীতে বিমানে বাস্তবে জনবল ছিল প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। সেই জনবল ছিল একটা বাস্তবসস্মত। কিন্তু হঠাৎ তৎকালীন সেনা শাসনের সময় ওয়ান ইলেভেন উদ্যোক্তারা বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শে ভলান্টারি রিটায়ার্ডমেন্ট সার্ভিস (ভিআরএস) নীতির আওতায় প্রায় অর্ধেক (২৫ শত) কে কিছু সম্মানী দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। এরপর মাত্র ৩৪ শত জনবল কাঠামোসহ আরও কয়েকটি শর্ত দিয়ে বিমানকে কর্পোরেশন থেকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি করা হয়। তারপর থেকেই বিমানের প্রথম পর্ষদ একটি সময়োপযোগী অর্গানোগ্রাম তৈরির উদ্যোগ নেয়। এক পর্যায়ে ২০১২ সালের দিকে আর্নেস্ট এ্যান্ড ইয়াং নামে একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অর্গানোগ্রাম তৈরি করা হয়। কিন্তু সেই অর্গানোগ্রামও ছিল বিমানের জন্য অযৌক্তিক। যাতে ছিল প্রায় দশ হাজার জনবলের প্রস্তাবনা। তারপর দ্বিতীয় দফা অর্গানোগ্রাম তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য পরিচালনা পর্ষদের চারজন প্রভাবশালী সদস্যের সমন্বয়ে একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির আদলেই দুটো আগের এবং বর্তমানের দুটো সাব-কমিটি কাজ করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সর্বশেষ বর্তমান পর্ষদেরও চারজন প্রভাবশালী সদস্যের সমন্বয়ে একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিই আগামী জুনের আগেই অর্গানোগ্রাম তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে নিশ্চিত করেছেন বর্তমান চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল ইনামুল বারী।
এদিকে গত দশ বছরেও কেন একটি অর্গানোগ্রাম তৈরি করতে পারেনি বিমান এ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে। ক্ষোভের কারণ একদিকে এত দীর্ঘ সময়ে কাজটি করতে না পারা অন্যদিকে বৈঠকের নামে বিপুল পরিমাণ টাকার আপ্যায়ন বিল ও সম্মানী গ্রহণ করা। বিমানে অপচয়ের জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই ব্যয়কে।
হিসাব শাখা জানিয়েছে- সাব-কমিটি গত দশ বছরে অর্গানোগ্রাম তৈরির জন্য কমপক্ষে দু’শ বৈঠক করেছে। প্রতিটি বৈঠকের অংশগ্রহণকারীদের বিএফসিসি থেকে অভিজাত খাবার দিয়ে আপ্যায়ন ও সম্মানীভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা। এর আগে আর্নেস্ট এ্যান্ড ইয়াং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ডলার। সব মিলিয়ে দুই কোটির মতো ব্যয় হলেও এখনও চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না অর্গানোগ্রাম। এ সম্পর্কে বিমানকর্মীদের প্রশ্ন- তাহলে কি শুধু বোর্ড মেম্বারদের উপরি রোজগারের জন্যই এ সমস্যা জিইয়ে রাখা হয়েছে? অথচ ক্যাজুয়াল শ্রমিকরা কিছু চাইতে গেলেই বিমান থেকে বলা হয় টাকার সঙ্কট। বিমানে একদিকে অপচয়ের হিড়িক চলছে- অন্যদিকে ব্যয় সঙ্কোচনের দোহাই দিয়ে যুুগের পর যুগ কাজ করা শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করার মতো সমস্যাকেই জিইয়ে রেখেছে।
বোর্ড সাব কমিটির একজন সদস্য জানান, আজকের বাস্তবতায় বিমানের মতো একটি এয়ারলাইন্সের জনবল কত হওয়া যৌক্তিক বা ন্যূনতম, সেটাই ঠিক করতে পারছে না সদস্যরা। একজন প্রস্তাব করেন ১০ হাজার থেকে ৯ হাজার। আরেক জন মতামত দেন ৮ থেকে ৭ হাজার। আরেক জন আরও বেশি। মূলত এই সিদ্ধান্তহীনতায় আটকে আছে অর্গানোগ্রাম।
অর্গানোগ্রামকে বিমানকর্মীদের প্রাণের এ দাবি উল্লেখ করে সিবিএ সভাপতি মশিকুর রহমান বলেন- ২০০১ সালের পর থেকেই বিমানে কোন বাস্তবসম্মত অর্গানোগ্রাম (সেট-আপ) হয় নাই। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ভি.আর.এস. এবং গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দিয়ে বিমান থেকে আড়াই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বাদ দিয়ে এক মাসের মধ্যে ১টি অর্গানোগ্রাম (সেট-আপ) তৈরি করা হয়। যা বিমানের কালো অর্গানোগ্রাম (সেট-আপ) নামে পরিচিত। সেই ২০০৭ সালের অর্গানোগ্রাম (সেট-আপ) থেকে পে-গ্রুপ (১) কে বাদ দেয়া হয়েছে। তারপর থেকেই বিমানের নেতৃত্বে যারাই ছিলেন, তারাই পে গ্রুপ এককে নানা অজুহাতে অর্গানোগ্রামের বাইরে রাখার জন্য নানা অজুহাত দেখিয়ে আসছেন। এমনকি সর্বশেষ যেই অর্গানোগ্রাম নিয়ে বর্তমান চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে সাব-কমিটির সদস্যরা দাবি করছেন, তারাও এ বিষয়ে দ্বিধান্বিত। চার সদস্যের এই সাব-কমিটি বছরের পর বছর ধরে বৈঠক করলেও পে গ্রুপ ১ প্রশ্নে কোন ধরনের ঐক্যমতে পৌঁছতে পারছেন না। দুজন সদস্য চাচ্ছেন পে গ্রুপ-১ রাখতে আর দুজন চাচ্ছেন বাদ দিয়ে আউট সোর্সিং করতে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, পিএলসিভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পে গ্রুপ -১ আছে কিনা, থাকলে কিভাবে আছে, সেটা খতিয়ে দেখা হচেছ। যদি থাকে তাহলে সেটাই অনুসরণ করা হবে।
দেশের অন্যতম পিএলসি রূপালী ব্যাংকসহ দেশের অন্যান্য পিএলসি প্রতিষ্ঠানে তো পে গ্রুপ-১ পদে স্থায়ী জনবল থাকার উদাহরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক বলেন, আমরা সেটাও খোঁজ নিচ্ছি। এ বিষয়ে আমরা সজাগ রয়েছি।
এ সম্পর্কে বিমান সিবিএ সভাপতি মশিকুর রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে বিমানে একটি বাস্তবসম্মত অর্গানোগ্রাম (সেট-আপ) তৈরি হয় নাই। কিন্তু কর্মপরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে ৮/১০ গুণ। ইতোমধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি সই হয়েছে যা আগামী ২০১৯ সালে শেষ হবে। তখন কাজের কর্মপরিধি আরও শতভাগ বৃদ্ধি পাবে। তাই বিমানের নীতিনির্ধারকদের ৭ মার্চের মধ্যে রূপরেখা প্রস্তুত করে ক্যাজুয়াল সব বিমানকর্মীদের চাকরি স্থায়ী করতে হবে।

সূত্রঃ দৈনিক জনকণ্ঠ

Aviation News