বাংলাদেশে এয়ারলাইনস পরিচালনা ব্যয় অনেক বেশি

এই লেখাটি 595 বার পঠিত

প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ভ্রমণে যায় ১৫ লাখ। বহির্গামী বাংলাদেশিদের ৭০ শতাংশই বহন করছে বিদেশি এয়ারলাইনস। যে ৩০ শতাংশ মানুষ দেশীয় এয়ারলাইনসে যাতায়াত করেন, তাদের ২৫ শতাংশ চড়েন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে। মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ বেসরকারি এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করেন। এভিয়েশন শিল্পের বিকাশমান এ বাজারে বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে দেশি এয়ারলাইনসগুলোর আরো অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লে. জেনারেল (অব.) এম ফজলে আকবর, এনডিসি, পিএসসি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিমানের পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশের পতাকা বহন করছে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো। রিজেন্টের লক্ষ্য সাশ্রয়ী খরচে আরামদায়ক ভ্রমণের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির আকাশপথে যাতায়াতের বিশ্বস্ত সঙ্গী হওয়া। এ লক্ষ্যে রিজেন্ট মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার দেশগুলোতে উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
২০১০ সালের ১০ নভেম্বর যাত্রা শুরু হয়েছিল রিজেন্ট এয়ারের। ৬টি বোয়িং ৭৩৭ এবং ২টি ড্যাশসহ মোট ৮টি উড়োজাহাজ দিয়ে বর্তমানে মাসকাট, কাতার, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, কলকাতা, কাঠমান্ডু, দাম্মাম আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বেসরকারি এ বিমান সংস্থা। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সৈয়দপুরে চলাচল করছে। রিজেন্ট এয়ারওয়েজের সিইও বলেন, ‘গত বছর অভ্যন্তরীণ যাত্রী পরিবহনে ৩৩ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে রিজেন্ট এয়ার।’
দেশে এয়ারলাইনসের জ্বালানি তেল, খুচরা পার্টস ও সরঞ্জামের মূল্যবৃদ্ধি, পার্কিং চার্জ, ভাড়া প্রতিযোগিতা বাড়ছে উল্লেখ করে এম ফজলে আকবর বলেন, ‘এয়ারলাইনস ব্যবসা একটা প্যাশন। আমাদের অনাবাসী বাংলাদেশিরা দেশীয় এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করে যদি খুশি হন সেটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি। আমাদের প্রবাসী কর্মীরা এয়ারক্রাফটে উঠে যেসব সেবা প্রত্যাশা করেন তা আমরা পূরণ করার চেষ্টা করি। আমাদের কেবিন ক্রুরা তাদের সঙ্গে বাংলায় কথা বলে, তাদের বাংলাদেশি সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করে। এ সবকিছু তারা পাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম খরচে।’
মধ্যপ্রাচ্যে প্রচুর বাংলাদেশি কর্মী রয়েছে। এ ছাড়া এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে মানুষ প্রচুর ভ্রমণ করছে। এসব গন্তব্যে উপস্থিতি বাড়াবে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী বললেন, ‘দোহা ও মাসকাট রুটের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলোতে রুট সমপ্র্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের শ্রমবাজারে প্রচুর বাংলাদেশি আছে। ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা সৌদির দাম্মামে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করতে যাচ্ছি। আবুধাবিতেও প্রচুর বাংলাদেশি রয়েছে এবং আরো ফ্লাইটের চাহিদা রয়েছে। মার্চে আমরা এই গন্তব্যে যাব।’
এরপর কলম্বো ও মালের কথাও চিন্তা করছে রিজেন্ট। এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে প্রচুর বাংলাদেশি পর্যটন ও চিকিৎসার জন্য যান। তাদের কম খরচে ভালো সেবা দিতে রিজেন্ট এশিয়ার গন্তব্যেও নজর দিচ্ছে। জাকার্তা, মালে, কলম্বো, চেন্নাই, গুয়াংজু রুটে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে রিজেন্টের। ইউরোপ-আমেরিকায় ফ্লাইট পরিচালনায় ওয়াইড-বডি এয়ারক্রাফটের প্রয়োজন হয়। সেখানে পরিচালন ব্যয়, প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। তার পরও চলতি বছরের শেষে লন্ডন যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে বলে সিইও জানালেন।
অভ্যন্তরীণ বাজারেও নজর রয়েছে তাদের। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ায় তারা বিমান ভ্রমণে আগ্রহী হয়ে উঠছে জানিয়ে এম ফজলে আকবর বলেন, ‘আমাদের এখন ২টা ড্যাশ এয়ারক্রাফট আছে, আরো তিনটি আসবে। এসব এয়ারক্রাফট নিয়ে আমরা শিগগিরই যশোর, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট গন্তব্যে যাব।’
দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর বিরুদ্ধে নোটিশ ছাড়াই ফ্লাইট দেরি হওয়া প্রসঙ্গে রিজেন্টের সিইও বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করি সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনা করার। কিন্তু অনেক সময় আবহাওয়া, এয়ারপোর্টে উচ্চ ট্রাফিকের কারণে দেরি হতে পারে। আমাদের লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে। দেখা গেল টেকনিক্যাল, আবহাওয়াজনিত কারণে ল্যান্ডিং দেরি হয়েছে। পরে সেই এয়ারক্রাফটটি অন্যান্য গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি করে ফেলে। এসব ক্ষেত্রে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর ব্যাকআপ এয়ারক্রাফট থাকে, যা দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর নেই। আমরা অন টাইম পারফর্মেন্স ঠিক রাখার চেষ্টা করি, কিন্তু তার পরও অনেক কখনো কখনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে পারা যায় না।’
তীব্র প্রতিযোগিতায় বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোকে টিকে থাকার জন্য সারচার্জ, এয়ারপোর্টের চার্জ, জ্বালানি খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন রিজেন্ট এয়ারওয়েজের সিইও। তিনি জানান, ভারতে এয়ারলাইনসগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ পায়, অথচ বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখাতে অর্থায়ন করতে চায় না।
বাংলাদেশ অপারেটিং ব্যয় অনেক বেশি। এতে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের সঙ্গে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। ’আমাদের দেশে সারচার্জ অনেক বেশি। পরিশোধে দেরি হলে বছরে ৭৮ শতাংশ ইন্টারেস্ট দিতে হয়, যা খুবই বেশি। এটা কমানো উচিত। জিএমজি, ইউনাইটেড এয়ারলাইসসের মতো এয়ারলাইনস বন্ধ হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে সব স্টেকহোল্ডার, সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এভিয়েশন খাতে সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে।’
স্বাধীনতাযুদ্ধে চট্টগ্রাম অঞ্চলের গেরিলা যোদ্ধা এম ফজলে আকবর ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ২০১৫ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি)-এর কমান্ড্যান্ট দায়িত্ব থেকে অবসরে যান। কর্মজীবনে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)-এর মহাপরিচালক, সেনাবাহিনী এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ব্রিগেডের কমান্ডার, ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহকারী প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাসহ গুরুত্ব অনেক দায়িত্ব পালন করেন। এক মেয়ের জনক ফজলে আকবর একজন ভালো গলফ খেলোয়াড়।
এম ফজলে আকবর সম্প্রতি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে ‘কানেক্টিভিটি ইন সাউথ এশিয়া: ইমপ্যাক্ট অন বাংলাদেশ ইকোনমি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গবেষণার বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তির চেয়ে সবাই অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করছে। এ জন্য আগের দিনের একলা চলো নীতি থেকে বেরিয়ে এখন বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আঞ্চলিক কিংবা ইউনিয়ন কনসেপ্টে পারস্পরিক উন্নয়ন করছে। এ কারণে আসিয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আমরা নিজেদের উন্নয়নে সার্ককে কাজে লাগাতে পারছি না। আমাদের কানেক্টিভিটি চীন পর্যন্ত আমরা বিস্তৃত করতে পারি। আবার আমরা আসিয়ানকে কাজে লাগিয়ে আমরা ব্যাংকক, মিয়ানমার হয়ে যেকোনো অঞ্চলের সঙ্গে আমরা যুক্ত হতে পারি। আমাদের আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে না পারলে আমরা ভবিষ্যতে পিছিয়ে পড়ব।’
‘নিরাপত্তা একটি পারসেপশন। একসময় এটা কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আমরা কাউকে ট্রানজিট দিলে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এমন ধারণা ভুল। আমাদের উন্নতি করতে হলে আঞ্চলিক জোটবদ্ধ হয়ে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে,’ গবেষণার প্রসঙ্গ ধরে এসব কথা যোগ করলেন ফজলে আকবর।

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

Aviation News