হজ আইন আটকে আছে খসড়ায়

এই লেখাটি 102 বার পঠিত

হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেশে কোনো আইন নেই। হজ আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হলেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি। ফলে জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতির ওপর ভিত্তি করেই চলছে যাবতীয় কার্যক্রম। আর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থে জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতিতে বারবার বিভিন্ন শর্ত সংযোজন ও বিয়োজন করে চলেছেন।

জানা গেছে, আগে হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে হজবিধি অনুযায়ী। কিন্তু বিধির ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশি অনেক হজ এজেন্সি নানা ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিতো। কিছু কিছু এজেন্সির মালিক হজ ব্যবস্থাপনার নামে সৌদি আরবে মানবপাচার করতেন। মানবপাচারসহ বিভিন্ন অনিয়ম বন্ধ করতে ২০১০ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি (২০১০-২০১৪) জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতি প্রণয়ন করে সরকার। কিন্তু ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাদের খেয়াল খুশি মতো প্রতিবছরই নীতিমালা সংশোধন করেন। তারা নীতিমালায় বিভিন্ন শর্ত সংযোজন ও বিয়োজন করেন, যা হজ মৌসুমে মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয়।

একপর্যায়ে সরকার হজযাত্রীদের হয়রানি বন্ধে হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম কঠোর করতে হজ আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হজকে একটি স্থায়ী ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে এ উদ্যোগ নেয় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ জন্য ২০১২ সালে হজ আইনের খসড়াও প্রস্তুত করা হয়; কিন্তু সেটি আজও বাস্তব রূপ পায়নি। ফলে জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতির ওপর ভিত্তি করেই চলছে হজের যাবতীয় কার্যক্রম। এ নীতিতে অনিয়ম, প্রতারণা ও মানবপাচার করলে লাইসেন্স বাতিল, জামানত বাজেয়াপ্ত, জরিমানা ও তিরস্কারসহ শাস্তির বিধান রাখা হলেও এজেন্সি মালিকের শাস্তির কোনো বিধান রাখা হয়নি। হজ আইন কার্যকর হলে হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার পাশাপাশি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যেত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সত্যি কথা বলতে হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো আইন নেই। জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতির মাধ্যমে হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে করে সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে থাকে। হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে সরকার হজ আইনের খসড়া প্রস্তুত করে ২০১৩ সালে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেছিল। মন্ত্রিসভা বৈঠকে হজ আইনের খসড়ার অনুমোদন দেয়নি। এটি সংশোধন করে মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। আইনের খসড়া ফেরত পাঠানোর পর হজের কার্যক্রম নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকায় ওই আইনের দিকে মনোনিবেশ করতে পারেননি। ফলে হজ আইনের খসড়া সংশোধনের বিষয়ে কাজ বন্ধ রাখা হয়। এর পর আর হজ আইনের খসড়া সংশোধন করা হয়নি।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান বলেন, হজ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতির ওপর ভিত্তিতে। ২০১৮ সালের হজ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এ খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভায় জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতি ২০১৮ অনুমোদন দেওয়ার পরই হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে।

ধর্ম সচিব আরও বলেন, ২০১২ সালে হজ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই সময়ে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছিল। এখন আবার খসড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে। খসড়া প্রস্তুতের কাজ শেষ পর্যায়ে। নতুন এ খসড়ায় আগেরটি থেকে কিছু অংশ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে হজ আইন অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। হজ আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও আইন পাস করা সময়সাপেক্ষ। তাই এ বছর হজ ও ওমরাহ নীতির মাধ্যমে হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। আশা করছি আগামী বছরের হজ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম হজ আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

হজ এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সাবেক এক নেতা আমাদের সময়কে বলেন, ২০১২ সালে হজ আইন করার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল মন্ত্রণালয়। ওই সময়ে হজ আইনের খসড়াও প্রস্তুত করা হয়েছিল। হজ আইনের খসড়া ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বৈঠক থেকে হজ আইনের খসড়া সংশোধন করে উপস্থাপন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হজ ও ওমরাহ সম্পর্কিত খুটিনাটি বিষয়গুলো ভালো করে জানতেন না। বিভিন্ন দেশের হজ আইনসংক্রান্ত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে তা খসড়ায় সংযোজন করে মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করার জন্য বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া জয়। এ জন্য হজে আইনের খসড়া তৈরির জন্য একটি বিশেষায়িত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সময়ে হজের মৌসুম হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। হজ শেষে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হজ আইনের খসড়া প্রস্তুতের আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। হজ আইনের ফাইলটি চাপা পড়ে যায়।

জানা গেছে, প্রতিবছরই সরকারি ও বেসরকারিভাবে বাংলাদেশ থেকে লাখের বেশি মুসল্লি হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে যান। হজে গমনকারী ৯০ শতাংশের বেশি যান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়, হজ এজেন্সির মাধ্যমে। হজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করার অভিযোগে বহু হজ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও স্থগিত, জামানত বাজেয়াপ্ত, জরিমানা আদায়সহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো আইন না থাকায় জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতিমালার ওপর ভিত্তি করেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

২০১৪ সালের হজ নীতিমালায় সহায়তাকারী দল সম্পর্কে উল্লেখ ছিল, সৌদি আরবে হজ চিকিৎসক দলকে সহায়তা করতে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ঢাকার হজ অফিসের গাড়িচালক ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সমন্বয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সহায়তাকারী পাঠানো যাবে। প্রয়োজনে এ মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তরগুলোর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। ২০১৭ সালে এ ধারাটি সম্পূর্ণ তুলে দিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন করে প্রতিনিধির সমন্বয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। নীতিমালার বাধ্যবাধকতা না থাকায় সহায়ক দলে নাম লেখাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা ধর্ম মন্ত্রণালয়ে তদবির করেন। অনেক অর্থ ব্যয় করে টিমে নাম লেখান।

২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রণীত নীতিমালায় ৩৫ জনকে প্রশাসনিক দলের সদস্য করে সৌদি আরবে পাঠানোর কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু ২০১৭ সালে নীতিমালা সংশোধন করে সেটি ৪৫ জন করা হয়েছে। কিন্তু নীতিমাল লঙ্ঘন করে ২০১৭ সালে প্রশাসনিক দলের সদস্য হিসেবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন ৫৪ জন। নীতিমালা অনুযায়ী, ২০১৭ সালে চিকিৎসক টিমের সদস্য হিসেবে সৌদি আরবে যাওয়ার বিধান ছিল ১২৭ জন; কিন্তু সেখানে গিয়েছেন ২৬৬ জন। চিকিৎসকদের সহায়তাকারী দলে পাঠানো হয় আরও ১৮৬ জন। চিকিৎসকদের সহায়তাকারী দলে এমন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নেওয়া হয়, যাদের অনেকেই এ কাজের উপযোগী নন।

২০১০ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি যে নীতিমালা প্রণীত হয়, তাতে রাষ্ট্রীয় খরচে হজ পালনের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না। এর পর ২০১৪ সালের মার্চে প্রণীত নীতিমালায় ১২৫ জনকে রাষ্ট্রীয় খরচে পালনের কথা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে প্রণীত জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতিমালায় ১২৫ জনের কোটা তুলে দিয়ে সেখানে উল্লেখ করা হয়, হজ ও ওমরাহ নীতিমালায় যা উল্লেখ থাকুক না কেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এবং ধর্মমন্ত্রী মনোনীত একটি নির্দিষ্টসংখ্যক মুসলমান রাষ্ট্রীয় খরচে হজ পালনে সৌদি আরব যাবেন। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয় খরচে হজ পালনে সৌদি আরব যান ৩৩২ জন।

অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নিজেদের সুবিধামতো হজ ও ওমরাহ নীতিমালার ধারা সংযোজন ও বিয়োজন করে থাকেন। ফলে অনিয়ম ও দুর্নীতিরোধে যেমন এটি খুব বেশি কাজে লাগে না, তেমনি অনিয়ম করেও সহজেই পার পেয়ে যান জড়িতরা। পূর্ণাঙ্গ আইন থাকলে তা সহজ হতো না।

Aviation News