হঠাৎ বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিতে মরিয়া রোহিঙ্গারা

এই লেখাটি 178 বার পঠিত

পাসপোর্ট করতে গত তিন জানুয়ারি ফরম ও যাবতীয় কাগজপত্রসহ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে আসেন মোকাদ্দেসা (২০)। তিনি নগরের ২৫ নম্বর ওয়ার্ড বড়পুকুর পার এলাকার রহমান ম্যানশনের বাসিন্দা। সঙ্গে নিয়ে আসেন মা ফাতেমা বেগমকে। চেহারা ও মুখের ভাষায় সন্দেহ হলে জেরার মুখে পড়েন মা-মেয়ে দুজনই। প্রবল জিজ্ঞাসাবাদের পর স্বীকার করেন, রোহিঙ্গা তরুণী মোকাদ্দেসাকে অর্থের বিনিময়ে মেয়ে সাজিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেতে সহযোগিতা করছিলেন ফাতেমা বেগম।

গত দুই সপ্তাহে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস মনসুরাবাদে এ ধরনের সাত রোহিঙ্গা ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট করতে এসে ধরা পড়েছে কর্মকর্তাদের হাতে। পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসেও এই সময়ে আরো চার রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। পরে তাদের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা জানান, হঠাৎ গত দুই সপ্তাহে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেওয়ার গোপন তৎপরতা বেড়ে গেছে। তারা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বিপুল অর্থের বিনিময়ে এই অপতৎপরতায় তাদের সহায়তা করছে কিছু বাংলাদেশি দালাল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল জানান, রোহিঙ্গাদের একটি পাসপোর্ট করিয়ে দিতে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অফারও দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে দেশে ফিরতে অনিচ্ছুক রোহিঙ্গাদের মধ্যে বাংলাদেশি পাসপোর্ট করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এই রোহিঙ্গারা বিদেশি আত্মীয়ের সহযোগিতায় মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দিতে চাচ্ছে। এ পর্যন্ত ধরা পড়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি।

নাসিরাবাদ পাসপোর্ট অফিসে গত কয় দিনে ধরা পড়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ হারুণ, পিতা-মোহাম্মদ ইউনুস, অস্থায়ী ঠিকানা আনন্দবাজার, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড। তিনি স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছেন সওদাগর পাড়া, ১ নম্বর ওয়ার্ড, লোহাগাড়া। ইয়াসমিন আক্তার, স্বামী জসিম উদ্দিন, অস্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ১ নম্বর ওয়ার্ড পাহাড়তলী এবং স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে চৌধুরী বাড়ি, উত্তর পোমরা, রাঙ্গুনীয়া ব্যবহার করা হয়েছে। মোকাদ্দেসা, পিতা-আসাদ উল্লাহ। স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছেন পশ্চিম এলাহাবাদ, কাঞ্চননগর, চন্দনাইশ। ইয়াছমিন আক্তার পিতা-মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মিয়া, অস্থায়ী ঠিকানা দিয়েছেন রমনা আবাসিক এলাকা, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড। স্থায়ী হিসেবে নগরের পশ্চিম বাকলিয়ার ৩০৫৯ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করেছেন তিনি। এঁদের সঙ্গে কথা বলার জন্য পাসপোর্টের ফরমের সঙ্গে দেওয়া মোবাইল নম্বরগুলোতে ফোন করলে প্রতিটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

পাসপোর্ট অফিসের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দালালদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের চুক্তির পর পাসপোর্ট অফিসে রোহিঙ্গা নারী কিংবা পুরুষকে আনার আগে অন্তত ১৫ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিশেষ করে বাবা-মায়ের নাম-ঠিকানা এবং চট্টগ্রামের ভাষা আয়ত্বে আনতে এই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সন্দেহমুক্ত থাকতে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে কক্সবাজার জেলার আওতাধীন কোনো জায়গার নাম ব্যবহার না করে চট্টগ্রাম জেলার অন্য কোনো উপজেলাকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গ্রাম এলাকার এমন মানুষের জন্মনিবন্ধন সনদ ও ঠিকানা ব্যবহার করা হচ্ছে যে নামে এখনো পাসপোর্ট করা হয়নি। ওই লোকের অজান্তেই তার নামে ফরম পূরণ করে পাসপোর্ট অফিসে জমা দিচ্ছে জালিয়াতচক্র।

তার পরও ফরম জমা দিতে এসে ধরা পড়ার মূল কারণ হিসেবে ভাষাগত পার্থক্যকেই চিহ্নিত করলেন বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস, মনসুরাবাদের উপপরিচালক আবু নোমান মো. জাকির হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ভাষার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ভাষাগত পার্থক্য রয়েছে। চট্টগ্রামের যেকোনো নাগরিক তা ধরতে পারবে। এ ছাড়া একটু জোর দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই ঠিকানা গুলিয়ে ফেলে তারা। পরে আরো চাপ দিলে তারা প্রতারণার কথা স্বীকার করছে। আটক করা রোহিঙ্গাদের স্থানীয় থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘গত তিন মাসে পাসপোর্ট করতে আসা তিনজন রোহিঙ্গা ধরা পড়লেও গত দুই সপ্তাহে হঠাৎ রোহিঙ্গাদের মধ্যে পাসপোর্ট করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এ জন্য ১১টি জেলা অফিসকে চিঠি দিয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে কোনোভাবে একজন রোহিঙ্গাও বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিতে না পারে।’

কক্সবাজার পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আবু নাঈম মাসুম জানান, তাঁর অফিসে গত চার মাসে এ ধরনের ১৪টি ফাইল জব্দ করা হয়েছে। এদের আটক করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ওই অফিসের জিরো টলারেন্সের কারণে রোহিঙ্গারা অন্যান্য এলাকায় গিয়ে পাসপোর্ট করার চেষ্টা করছে।

পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে পাসপোর্ট অফিস পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টের ওপর জোর দেয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চিহ্নিত না হলে রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করতেও পাসপোর্ট অফিসের শেষ ভরসা পুলিশ ভেরিফিকেশন। কারণ পুলিশ রিপোর্ট পাওয়ার পর পাসপোর্ট অফিস পাসপোর্ট ইস্যু করতে বাধ্য। এ কারণে পাসপোর্ট পেতে রোহিঙ্গাদের সাম্প্রতিক তৎপরতায় পুলিশও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে।

তবে রোহিঙ্গাদের আটক করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, মামলায় বাদী হলে দীর্ঘদিন সেই মামলার দায় বয়ে বেড়াতে হয়। অন্য কোথাও বদলি হলেও মামলার হাজিরা দিতে আসতে হয়। এ কারণে ঝামেলা এড়াতে মামলা করা হয় না। পুলিশের মাধ্যমে তাদের ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়।

পুলিশের বিশেষ শাখার উপকমিশনার মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বলা আছে, বাসাবাড়িতে গিয়ে সরেজমিন দেখে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে তারপর রিপোর্ট দিতে। সব পাসপোর্টের ক্ষেত্রেই একই নির্দেশনা আছে। রোহিঙ্গাদের কারণে বর্তমানে আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।’

Aviation News