সর্বোচ্চ জনশক্তি রপ্তানিঃ ১০ লাখ কর্মী গেছে বিদেশে

এই লেখাটি 156 বার পঠিত

জনশক্তি রপ্তানিতে গত ৪১ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবার। চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে গেছে প্রায় ১০ লাখ কর্মী।
সর্বশেষ হিসাব বলছে, এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ লাখ ৯০ হাজার ৭২৮ জন কর্মী বিদেশে গেছে। তবে এ বছরের বাকি কয়েক দিনে এই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, এ বছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবেই গেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ কর্মী। এর পরই আছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার ও ওমান।
হিসাব বলছে, পুরুষের পাশাপাশি নারী কর্মী বিদেশে যাওয়ার দিক থেকেও সৌদি শ্রমবাজার এগিয়ে আছে। ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে এক লাখ ১৯ হাজার ৬৯৭ নারী কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবেই গেছে ৮১ হাজার ৫১৩ জন।
জনশক্তি রপ্তানির রেকর্ড প্রসঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছরগুলোর তুলনায় ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ জনশক্তি রপ্তানি করা হয়েছে। আগামীতে পুরনো বাজারের পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর প্রচেষ্টা চলছে।

তবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. নমিতা হালদার বলেন, ‘চলতি বছরে ১০ লাখ কর্মী যাওয়ায় আমি খুব হ্যাপি (খুশি) তা নয়। কারণ যেসব কর্মী গেছে, তাদের বেশির ভাগই অদক্ষ। বেশি বেশি দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারলেই আরো বেশি খুশি হব। বিদেশে আমাদের শ্রমিকরা ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব। ’
ড. নমিতা হালদার জানান, অদক্ষ শ্রমিকরাই বিদেশে গিয়ে বেশি কষ্টে থাকে। আর রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা বন্ধে সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, এবার সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে মালয়েশিয়ায়; ৯৬ হাজার ৪৭৭ জন। এরপরে আছে যথাক্রমে ওমান (৮৭ হাজার ৬৬১), কাতার (৮০ হাজার ৭৯৭), সিঙ্গাপুর (৩৯ হাজার ৬৯০), জর্ডান (২০ হাজার ২১৫) এবং বাহরাইন (১৯ হাজার ২৭৩)।
১৯৭৬ সালে সর্বপ্রথম জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়। ওই বছর গিয়েছিল ছয় হাজার ৮৭ জন। ৪১ বছরের মধ্যে এবারের আগের রেকর্ড ছিল ২০০৮ সালে। ওই বছর জনশক্তি রপ্তানি হয়েছিল আট লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ জন।
বেশি জনশক্তি রপ্তানির পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ প্রায় প্রতিটি দেশেই উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। অথচ অভিবাসন ব্যয় না কমালে জনশক্তি খাতের সুফল পাবে না প্রবাসী কর্মীরা। প্রবাসে মাসের পর মাস খেটেও খরচ ওঠাতে পারে না প্রবাসীরা।
এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি আরো বলেন, ‘২০১৭ সালে শ্রম কূটনীতির সাফল্য অনেক বেশি। জি টু জি প্লাস (সরকারিভাবে) প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে মালয়েশিয়ায় আমরা এক লাখের বেশি কর্মী পাঠিয়েছি। ’
মন্ত্রী জানান, এ বছর মার্চ মাসে জাপানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন কর্মী পাঠাতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং মরিশাস ও রাশিয়ার সঙ্গেও কর্মী পাঠানোর বিষয়ে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এসব চুক্তি অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে যাবে বলে আশা করছেন মন্ত্রী।
দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে ৭০টি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ৪৮টি ট্রেডে দেশের তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রশিক্ষণের গুণগত মানে কোনো আপস করছি না। ’
চলতি বছরে শতকরা ৩৭ ভাগ দক্ষ কর্মী বিদেশে গেছে জানিয়ে মন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামী বছরে প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ দক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠাতে পারব। পর্যায়ক্রমে শতভাগ দক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে। ’
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছর জনশক্তি রপ্তানি হয়েছিল সাত লাখ ৫৭ হাজার ৭৭১ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবে এক লাখ ৪৩ হাজার ৯১৩, ওমানে এক লাখ ৮৮ হাজার ২৪৭, কাতারে এক লাখ ২০ হাজার ৩৮২, বাহরাইনে ৭২ হাজার ১৬৭, মালয়েশিয়ায় ৪০ হাজার ১২৬ এবং সিঙ্গাপুরে ৫৪ হাজার ৭৩০ জন।
চলতি বছরের সঙ্গে আগের বছরের এই তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় গত বছরের তুলনায় এবার জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও অন্যান্য দেশে কমেছে।
সে ক্ষেত্রে চলতি বছর ১১ মাসে রেমিট্যান্স আসে এক লাখ ৬১৬ কোটি টাকা। গত বছর আসে এক লাখ সাত হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। প্রথম বছর রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
অভিবাসন ব্যয় কমানোর বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছরেই সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ ১৫টি দেশের অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, ‘দালালের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ায় কর্মীরা বেশি প্রতারিত হচ্ছে। তাই সরাসরি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার জন্য ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছি। শুধু তাই নয়, অভিবাসনে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলো চিহ্নিত করে ওই সব জেলার লোকজনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ’
তবে চলতি বছর সৌদি আরবে সর্বোচ্চ সংখ্যক জনশক্তি রপ্তানি হলেও দেশটিতে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর বেশ কিছু বিধি-নিষেধ ও কড়াকড়ি আরোপ করায় আসছে বছর তা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রবাসী কর্মীরা।
সৌদিতে অবস্থানরত একাধিক প্রবাসী কালের কণ্ঠকে জানায়, এখন প্রতিটি পণ্যে মাত্রাতিরিক্ত কর নির্ধারণ করে দিয়েছে সৌদি সরকার। থাকা, খাওয়া থেকে শুরু করে সর্বত্রই করের বোঝা। শ্রমিকরা যে বেতন পায়, সেখান থেকে এখন বড় অংশ ট্যাক্সের নামে চলে যায় সরকারের কোষাগারে। ফলে সেখানে গিয়ে থেকে-খেয়ে দেশে টাকা পাঠানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সভাপতি বেনজির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনশক্তি রপ্তানিতে চলতি বছর আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এই খাতের প্রতারণাও অনেকটা কমে আসছে। অভিবাসন ব্যয় কমানোর বিষয়ে আমরা চেষ্টা করছি। ’

Aviation News