ভ্রমণে ড্রোন

dji-mavic-pro-XLআপনার সীমানা যেখানে শেষ হবে সেখান থেকে আপনার চোখ পাখা মেলে উড়তে শুরু করবে! আহ! ভাবতেই কত ভালো লাগে যে ছোট্ট একটা যন্ত্র ব্যবহার করে আমরা সেই জায়গাগুলোর ছবি এমনকি ভিডিও নিতে পারি যেখানে ভ্রমণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না এখনো। আরও অসংখ্য সম্ভাবনার দ্বার খোলা রয়েছে ভ্রমণে খুব ছোট একটি যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে। যে কোনো জায়গার ছবি আমরা নিতে পারব ৩০ থেকে ৩০০ ফিট উচ্চতা থেকে কিন্তু আমাদেরকে উঠতে হবে না সেখানে। আমাদের দেশেই এর ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। যে যন্ত্রের কথা বলছি তার নাম ‘ড্রোন’। আপনার জন্য আমাদের আজকের নিবেদন ভ্রমণে ড্রোনের আদ্যোপান্ত।
ড্রোন কি:
ড্রোন মানে মনুষ্যবিহীন আকাশযান। অর্থাৎ, যা আকাশে কোনো চালক ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট কোডিং এর আওতায় চলাচল করতে পারে। তবে, চালকবিহীন এই সমস্ত আকাশযানেরও একজন চালক থাকেন কিন্তু তিনি তা নিয়ন্ত্রণ করেন ভূপৃষ্ঠের উপর দাঁড়িয়ে।‌ অর্থাৎ সহজ কথায় যা দাঁড়ায়, ড্রোন হলো এমন একটি যন্ত্র যা আকাশে উড়তে পারে কিন্তু আকাশে এর সাথে কোন চালক যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। আজকের পৃথিবীতে এই নামটি একটি অতি পরিচিত নাম। বিশ্বময় যুদ্ধ ক্ষেত্রে এর ব্যাবহার পুরো মানব জাতিকে গত কয়েক বছর ধরে আতঙ্কিত করে রেখেছে।
কিন্তু আমরা যে ধরনের ড্রোন নিয়ে কথা বলছি তা মোটেও যুদ্ধবিমানের আকারের তো নয়ই বরং এগুলো আসলে বাচ্চাদের খেলনা হেলিকপ্টারের সমান আকারের এক একটি যন্ত্র।
কি ধরনের ড্রোন ব্যবহার কর যেতে পারে ভ্রমণে:
ভ্রমণে কি ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা যেতে পারে তার আগে প্রথমেই যে বিষয়টি জেনে রাখা দরকার, ড্রোন ব্যবহার করে আমরা মূলত কী ধরনের কাজ করতে পারি? কারণ এর উপরে নির্ভর করবে আমরা কি ধরণের ড্রোন কিনব। একটি ভ্রমণে এ ধরণের যন্ত্র দিয়ে মূলত ছবি তোলা ও ভিডিও তৈরি করা এই দুটো মুখ্য কাজই করা সম্ভব। তাই ভ্রমণে এমন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করতে হবে যেটা ভালো মানের ক্যামেরা বহন করতে সক্ষম। এবার চলুন দেখে নেওয়া যাক কোন ধরণের ড্রোন আমাদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে।
প্যারোড বিপব: এটি একটি অত্যন্ত আধুনিক যন্ত্র যা তৈরির সময় এর মধ্যে ক্যামেরা দিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা জানি আকাশে ভেসে কোনো কিছুর ওপর ফোকাস করা প্রায় দুঃসাধ্য। আর সেই কাজটি খুবই স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে করতে পারে এই যন্ত্রটি। এতে সংযোজন করা হয়েছে ১৮০ ডিগ্রি ফিসআই ক্যামেরা এবং অত্যাধুনিক সব ভিডিও ধারণের সফটওয়্যার। তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অসাধারণ ছবি ও ভিডিও করতে পারে এই যন্ত্রটি। এতে রয়েছে জিপিএস ডিটেক্টরে, অটো ল‍্যান্ডিং এবং যেকোনো পরিস্থিতি আর অ্যাঙ্গেলের ছবি তুলবার সুবিধা। মাত্র ৪০০ গ্রাম ওজনের দুইটি ব্যাটারির সাহায্যে ২২ মিনিট আকাশে উঠতে পারে ড্রোনটি।
প্যান্টম ২ ভিশন: অত্যাধুনিক ষ্টিল ফিস ক্যামেরাযুক্ত ড্রোন জগতের আরেক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম ‘প্যান্টম ২ ভিশন’। ৩০০ মিটার দূরত্ব থেকে আপনাকে ওয়াইফাই এর মাধ্যমে সিগন্যাল দিতে এবং গ্রহণ করতে সক্ষম এই ড্রোনটি জিপিএস প্রযুক্তির ব্যবহার করে শূন্যে স্থির অবস্থায় থাকতে পারে। অর্থাৎ এটিতে ব্যবহৃত ক্যামেরা যেকোনো জায়গার স্থিরচিত্র অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিতে পারে‌‌। সার্বক্ষণিক ওয়াইফাই সাথে যুক্ত থাকায় মুহূর্তের ছবি , অবস্থান, ক্যামেরা ভিউ, সরাসরি ভিডিও চিত্র প্রকাশে সক্ষম এই যন্ত্রটির বাজার মূল্য ৯৯৯ মার্কিন ডলার।
ওয়াকার কিয়আর ডব্লিউ ১০০এস: এটি একটি অত্যন্ত কার্যকরি উড়ন্ত ক্যামেরার অনুভূতি দিতে সক্ষম যে কোনো ভ্রমণকারীকে। প্যান্টম ২ ভিশন এ আপনি যে যে সুবিধা পাবেন তার প্রতিটি এই ওয়াকার কিয়আর ডব্লিউ ১০০এস এও আপনি পাবেন। তবে এই ডিভাইসটির বিশেষত্ব হলো এটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর এর ক্যামেরা থেকে আপনাকে আপনার স্মার্টফোনে সরাসরি ভিডিও পাঠাতে সক্ষম এই যন্ত্রটি। এর বর্তমান বাজার মূল্য ১৬০ মার্কিন ডলার।
এই তিনটি ড্রোন আসলে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহারের কারণ হলো এগুলোর সমসাময়িক যে কোনো ড্রোন আপনার ভ্রমণ সংক্রান্ত প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম। আর তাই এগুলোকে মাথায় রেখে আপনি কিনে অথবা তৈরি করে নিতে পারেন আপনার ড্রোন।
ভ্রমণে ড্রোনের ব্যবহার:
আগেই যে বিষয়টি বলেছিলাম ভ্রমণে ড্রোনের ব্যবহার আসলে আরও আগে থেকেই শুরু হয়েছে। এমনকি আমাদের দেশেও ভ্রমণে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। আসুন এই বিষয়টি নিয়ে কিছু বিস্তারিত জানা যাক। কি কি কাজে লাগতে পারে ড্রোন:
যারা ভ্রমণ করেন তারা খুব ভালো করেই জানেন আমরা অনেক ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করার পর আর এগিয়ে যেতে পারি না। এর পেছনে নিরাপত্তা, পরিবেশ, তথ্যের অভাব, রাস্তার সংকটসহ আরও বহু কারণ থাকে। কিন্তু কারণ যেটাই হোক না কেন আমরা যেখানে গিয়ে শেষ করি তার পরে কি আছে তা আর আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। এই ড্রোনগুলো আমাদের সেই সকল সমস্যার জন্য এক চমৎকার সমাধান হতে পারে। আমরা যেই জায়গাগুলোতে গিয়ে থেমে যেতে বাধ্য হব সেই জায়গাগুলো থেকে আমাদের ড্রোনগুলো উড়তে শুরু করলে আমাদের আর থেমে থাকতে হবে না। আমরা এর চোখ দিয়ে আরও বেশ কিছু কিলোমিটার এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো।
ড্রোন যেমন উচ্চতাকে নিয়ে আসে চোখের সামনে তেমনই ড্রোনের চোখে একটি জায়গাকে দেখা মানে হলো পাখির চোখে দেখা। একটি বিশাল এরিয়ার ‘বার্ড আই ভিউ’ একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে পাওয়া সম্ভব। আপনি একটি বনের ভিডিও করতে চান বা কোনো নদীর। অথবা বিশাল কোনো জায়গার। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বা হেঁটে আপনি কাছাকাছি এঙ্গেলের ভিউ পাবেন। কিন্তু আপনার ক্যামেরাটি যখন উড়তে শুরু করবে তখন সে তুলে আনবে উচ্চতা থেকে এক নজরে সমগ্র জায়গাটির ভিউ যা ভিডিওচিত্রটিতে যোগ করবে নতুন মাত্রা।
ভ্রমণে বিশেষ করে এমন জায়গা ভ্রমণে যেখানে এখনো কেউ যায়নি, সামনের দিকে কি আছে তা না জেনেই আমাদের এগিয়ে চলতে হয়। যা অনেক ক্ষেত্রেই বিপদের কারণ হয়। তাই যদি আমরা ড্রোন ব্যবহার করে সামনের দিকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখে নিতে পারি তাহলে আমাদের জন্যে ভ্রমণে নিরাপত্তার দিকটি নিশ্চিত করা সহজ হবে। আর এই ড্রোনগুলো আমাদেরকে সামনের পাহাড়ের পেছনের অবস্থা, সামনের বনের ঘনত্ব আর দূরত্ব সবই জানাতে পারবে।
আপনার করা ভ্রমণ ভিডিওগুলোতে নতুন মাত্রা যোগ করে দিতে পারে একটি ছোট ড্রোনের ব্যবহার। আপনি আর আপনার ভিডিও হয়ে উঠবেন বাকিদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। পাশাপাশি আপনার ক্যামেরা পাবে দিগন্তজুড়ে উড়ে বেড়ানোর জন্যে ছোট্ট ছোট্ট পাখা।
নিরাপত্তা:
ড্রোনের এত গুণগান পড়ে এখনই একটি ড্রোন কিনে ফেলতে আপনার ইচ্ছা করতেই পারে কিন্তু সেই কাজটি করার ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই কিছু আইন ও নীতিমালা জানতে হবে, পাশাপাশি মেনেও চলতে হবে। কারণ ড্রোন ব্যবহারের জন্যে বিশেষ কিছু নীতিমালা ইতোমধ্যে আমাদের সরকার প্রদান করেছেন। সে সকল নীতিমালার একটিতে বাংলাদেশে ড্রোনের আমদানি নিষিদ্ধ করা আছে। পরবর্তীতে অবশ্য এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ড্রোন আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের নির্দিষ্ট ফর্মে আবেদন করে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। বিষয়টি একটু জটিল মনে হলেও অসম্ভব বা দুঃসাধ্য মোটেও না। আর আমরা তো কত কিছুরই লাইসেন্স নিয়ে থাকি। তাই এটিও খুব বড় কোনো সমস্যা না। নিরাপত্তার ব্যাপারে ২য় যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাহলো ড্রোন উড়ানোর ৪৫ দিন পূর্বে বেসামরিক বিমান ও পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি গ্রহণ করা। কারণ, একটি ড্রোন যে কোনো সময়ে বিমানের রাডারে ধরা পড়ে বিশাল বিপত্তি তৈরি করতে পারে। আর তাই ড্রোন ওড়ানোর আগে অবশ্যই ড্রোন উড়ানোর আইন জেনে নিয়ে বিধি মোতাবেক অনুমতি গ্রহণ করে তার পর ওড়াবেন। অন্যথায় আপনার ড্রোনটি তো বাজেয়াপ্ত হতেই পারে আবার আপনিও আইন ভাঙ্গার দায়ে অপরাধী হতে পারেন।
ভ্রমণে ড্রোনের ব্যবহার একেবারেই নতুন। তবে এর সম্ভাবনা ও কার্যকারিতার বিস্তৃতি অনেক। তাই আমারা আশা করছি ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে এর আইনে আসবে নানান পরিবর্তন। আর পাশাপাশি এর চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে দামও সাধারণ ভ্রমণকারীদের হাতের নাগালে চলে আসবে।

Aviation News

সম্পাদক: তারেক এম হাসান
যোগাযোগ: জোবায়ের অভি, ঢাকা, ফোন +৮৮ ০১৬৮৪৯৬৭৫০৪
ই-মেইল: jobayerovi@gmail.com
যুক্তরাস্ট্র অফিস
ইউএসএ সম্পাদক: মো. শহীদুল ইসলাম
৭১-২০, ৩৫ অ্যাভিনিউ, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক ১১৩৭২
মোবাইল: +১ (২১২) ২০৩-৯০১৩, +১ (২১২) ৪৭০-২৩০৩
ইমেইল: dutimoy@gmail.com
এডিটর ইন চিফ : মুজিবুর আর মাসুদ ইমেইল: muzibny@gmail.com
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত এভিয়েশন নিউজবিডি.কম ২০১৪-২০১৬