ঘুষ না দিলে মেলে না পাসপোর্ট

রাজশাহী-1রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসে দুটি পাসপোর্টের আবেদনের ফরমসহ অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন গোদাগাড়ী উপজেলার ওমর ফারুক হোসেন। বাবার চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যেতে হবে—তাই নিজের ও বাবার জন্য জরুরি পাসপোর্ট করতে এসেছিলেন।

কিন্তু কাগজপত্র জমা দিতে গেলে অফিস সহকারী জানান, বড় হাতের অক্ষরে (ক্যাপিটাল লেটার) যা লেখার কথা তা ছোট হাতের অক্ষরে লেখা হয়েছে কেন? একটি স্থানে বাংলার জায়গায় ইংরেজিতে লিখেছেন কেন? আবেদন জমা নেওয়া হবে না। ঠিক করে নিয়ে আসেন। এটা গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকের কথা।

ফারুক জানালেন, আগের দিন বুধবারও তিনি একই কাগজপত্র জমা দিতে গিয়েছিলেন। তখন অন্য ভুল ধরা হয়েছিল। সেই সময় দেলোয়ার হোসেন নামের ওই অফিস সহকারী বলেছিলেন, ‘এসব ভুল কোনো ব্যাপার না; দেড় হাজার করে টাকা দেন, সময়মতো এসে পাসপোর্ট নিয়ে যাইয়েন। ’ কিন্তু দুটি পাসপোর্টের জন্য তিন হাজার টাকা ঘুষ দিতে রাজি হননি তিনি (ফারুক)। তাই বুধবার কাগজপত্রে যেসব ভুল ধরা হয়েছিল সেগুলো সংশোধন করে পরের দিন জমা দিতে যান। কিন্তু এদিন আবার নতুন ভুল ধরে তাঁর কাগজপত্র আর জমা নেওয়া হয়নি।

জানা গেল, নানা ভুলত্রুটি থাকলেও নজরুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তির পাসপোর্টের আবেদন ঠিকই জমা নেন দেলোয়ার হোসেন। বিনিময়ে তাঁর কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা নিয়েছেন। আনসার সদস্য জিয়ার মাধ্যমে ওই পাসপোর্ট করিয়েছেন দেলোয়ার হোসেন। রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসে এভাবেই মানুষকে জিম্মি করে প্রতিদিন চলছে ঘুষের লেনদেন। পাসপোর্টের আবেদন জমা নেওয়ার নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লেনদেন হচ্ছে। কখনো বাইরের দালালদের মাধ্যমে, কখনো পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের মাধ্যমে পাসপোর্টপ্রতি এক হাজার ৫০০ টাকা করে লেনদেন করছেন ওই অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক আফজাল হোসেন থেকে শুরু করে অফিস সহকারী দেলোয়ার হোসেন, আনসারের পিসি হাসান আলী, আনসার সদস্য জিয়াসহ ওই অফিসের বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকা ছাড়া পাসপোর্টের আবেদন জমা নেন না। কমপক্ষে এক হাজার ৫০০ টাকা দিলে এক দিনেই আবেদনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে দেন তাঁরা। পরে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কোনো একদিন এসে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে নিয়ে যায় আবেদনকারীরা। কিন্তু টাকা না দিলে রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসে সাধারণ মানুষের কোনো আবেদন জমা নেওয়া হয় না। নানা ধরনের ভুলত্রুটি ধরে দিনের পর দিন হয়রানি করা হয়। গত দুই-তিন দিন ধরে অনুসন্ধানেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে।

টাকা লেনদেনের জন্য পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কখনো কখনো স্থানীয় দালালদেরও সহায়তা নেন। দালালরা আবেদনকারীদের কাছ থেকে এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেন। এরপর পাসপোর্টের আবেদন জমা নেওয়া হয়। দালালদের এই গ্রুপে রয়েছেন স্থানীয় মোস্তাক হোসেন, সোহরাব হোসেন, সুমন, রাজিব, দেবু, সনি, মানিকসহ ১৭ থেকে ১৮ জন।

তবে টাকা না দেওয়া আবেদনকারীদের হয়রানির শেষ নেই। পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে এসে দিনের পর দিন ঘুরে যেতে হয় তাদের। শেষে বাধ্য হয়ে একসময় হার মানে এবং দেড় হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে পাসপোর্ট করায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সাধারণ মানুষের পাসপোর্টপ্রতি অন্তত ৮০০ টাকা না হলে উপপরিচালক সই করেন না। বাকি ৭০০ টাকা চলে যায় পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে।

দুর্গাপুর উপজেলার ওয়াদ আলী নামের এক আবেদনকারী বলেন, ‘প্রথমে আমি কয়েক দফা আবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বারবারই ভুল ধরে আমাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একবার আবেদনে ভুল ধরা হলে সেটি সংশোধন করতে আবার নতুন করে আবেদন ফরম পূরণ করতে হয়। আর প্রতিটি আবেদন ফরমেই লাগে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সই। এভাবে তিন দিন ঘোরার পরে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট অফিসের আনসারের পিসি হাসান আলীকে দুই হাজার টাকা দিয়ে আবেদন জমা দিতে পেরেছি। ’ তবে আনসারের পিসি হাসান আলী দাবি করেন, আবেদন জমা নেওয়া তাঁদের কাজ নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ নিরাপত্তা দেওয়া। আমরা কেন মানুষের কাছ থেকে টাকা নেব। এটা যারা বলছে, তারা ঠিক বলেনি। আমরা কারো কাছ থেকে টাকা নিইনি। ’

পাসপোর্ট করতে আসা সোলাইমান নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘রাজশাহীর মধ্যে এখন এই অফিসটিতেই সবচেয়ে খোলামেলা টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু এ নিয়ে কেউ কখনো প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। সরকারি অফিস ও পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হাতে পাওয়ার জন্য কেউ এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে চায় না। নীরবে টাকা দিয়ে চলে যায় সাধারণ মানুষ। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী বা প্রভাবশালী আমলা বা সরকারি কর্মকর্তা হলে টাকা ছাড়াই ব্যবস্থা করে দেন উপপরিচালক আফজাল হোসেন। এর বাইরে তাঁর সই ছাড়া এবং অন্তত এক হাজার ৫০০ টাকা ছাড়া এই অফিসে একটি আবেদনও জমা নেওয়া হয় না। ’

তবে ভুক্তভোগীরা কাছে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও অফিস সহকারী দেলোয়ার হোসেন তা অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য মতে, ‘আমি কারো নিকট থেকে টাকা নিই না। আবেদনে ভুল থাকলে তো সেগুলো ধরতেই হবে। না হলে যা ইচ্ছে তাই লিখে দিলে তো আর পাসপোর্ট হবে না। ’

ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে উপপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমার অফিসে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে কাউকে টাকা দিতে হয় না। এই ধরনের অভিযোগ সত্য নয়। ’

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

Aviation News

সম্পাদক: তারেক এম হাসান
যোগাযোগ: জোবায়ের অভি, ঢাকা, ফোন +৮৮ ০১৬৮৪৯৬৭৫০৪
ই-মেইল: jobayerovi@gmail.com
যুক্তরাস্ট্র অফিস
ইউএসএ সম্পাদক: মো. শহীদুল ইসলাম
৭১-২০, ৩৫ অ্যাভিনিউ, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক ১১৩৭২
মোবাইল: +১ (২১২) ২০৩-৯০১৩, +১ (২১২) ৪৭০-২৩০৩
ইমেইল: dutimoy@gmail.com
এডিটর ইন চিফ : মুজিবুর আর মাসুদ ইমেইল: muzibny@gmail.com
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত এভিয়েশন নিউজবিডি.কম ২০১৪-২০১৬