শাহজালালে একটি লাগেজ খালাসেই ঘুষ দাবি ৩২ হাজার টাকা!

সৌদি আরব থেকে পাঠানো লাগেজ আনতে গিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান লোকমান আলী। ছবি : এনটিভি

সৌদি আরব থেকে পাঠানো লাগেজ আনতে গিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান লোকমান আলী। ছবি : এনটিভি

শাহজালাল বিমান বন্দরে লাগেজ আনতে গিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায়  প্রান হারান লোকমান আলী মানে এক ব্যাক্তি। এনিয়ে এনটিভি অনলাইনে আজ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলঃ

সৌদি আরবে কাজ করেন ঢাকার দোহার উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের মিনজু আক্তার। ঈদুল আজহার পাঁচদিন আগে বাংলাদেশে বসবাসরত স্বামী লোকমান আলীর (৫৫) নামে কিছু মালপত্র পাঠান তিনি। মোট ৫৬ কেজি ওজনের ওই লাগেজে ছিল পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য পাঠানো উপহার সামগ্রীসহ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস।

এরপর ঈদুল আজহার দিনেই সৌদি আরব থেকে দেশে এসে পৌঁছান মিনজু আক্তার। তবে সে দিনের আগে পাঠানো ওই লাগেজ খালাস করতে পারেননি তিনি। মিনজু আক্তারের দাবি, সেই সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমসের ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্টস (সিঅ্যান্ডএফ) কর্মকর্তারা ওই লাগেজ খালাস করতে ৩২ হাজার ২৪০ টাকা ঘুষ দাবি করেন।

মিনজু আক্তার আরো জানান,ওই লাগেজে সব মিলিয়ে এত টাকার জিনিসই ছিল না যে তা ৩২ হাজার টাকা দিয়ে খালাস করতে হবে। তাছাড়া ওই মুহূর্তে ঘুষ দেওয়ার মতো অর্থ না থাকায় লাগেজটি খালাস না করেই বাড়ি ফেরেন তিনি। তখন কাস্টমস কর্মকর্তা তাঁদের আপাতত এক হাজার টাকা বিকাশ করতে বলেন। ওই টাকা বিকাশ করার পর কাস্টমস কর্মকর্তা আরো ২২ হাজার টাকা দিয়ে লাগেজ নিয়ে যেতে বলেন।

ওই লাগেজ ছাড়াতে গত শনিবার দোহার থেকে বিমানবন্দরে যাচ্ছিলেন মিনজুর স্বামী লোকমান। তিনি বসেছিলেন সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশায়। পথে অপর অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন তিনি। দুর্ঘটনার পর অটোরিকশাচালক নিজেই তাঁকে ঢাকায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) নিয়ে যান। কিন্তু সেখান থেকে তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর লোকমানকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মিনজু আক্তারের পরিবারের সদস্যদের দাবি,সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ঘুষ খাওয়ার প্রবণতাই কেড়ে নেয় লোকমান আলীর প্রাণ। কাস্টমস এজেন্টস হাবিবুর রহমান ও আবদুর রবের খপ্পরে পড়ে ভোগান্তিতে দিশেহারা হয়ে শেষমেশ জীবনই চলে গেল লোকমানের।

জানা গেল, শুধু এজেন্টরাই নয়, এই অবৈধ ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারাও।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এনটিভি অনলাইনের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদক মিনজু আক্তারের বোনের ছেলে সেজে লাগেজ খালাস করার নাম করে গাজী এন্টারপ্রাইজের কাস্টমস এজেন্ট হাবিবুর রহমান এবং নাভারন শিপিং লাইনের এজেন্ট আবদুর রবের সঙ্গে কথা বলেন।

এ সময় হাবিব বলেন, ‘কাল সকালেই আপনার খালাকে নিয়ে চলে আসেন বিমানবন্দরে। আপনাদের কোনো কাজই করা লাগবে না। টাকা দিয়ে বসে থাকবেন, সময়মতো মাল পেয়ে যাবেন।’

যেহেতু হাবিব শুরুতে চাওয়া ৩২ হাজার টাকা ধীরে ধীরে কমিয়ে ২২ হাজারে এনেছেন, সেহেতু তিনি চাইলে আরো কিছু কমাতে পারেন বলে তাঁকে জানান এই প্রতিবেদক। জবাবে হাবিব বলেন, ‘আগামীকাল সকালে আবদুর রবকে আপনারা ১৫ হাজার টাকা দিবেন। আপনাদের আর সাইন-টাইন কিছুই করা লাগবে না। আর আপনারা মাল খালাসটা যদি লিগ্যাল ওয়েতে করতে চান, তাহলে অনেক বেশি টাকা খরচ হবে। কিন্তু আমাদের দ্বারা ইলিগাল ওয়েতে কন্টাক্টের মাধ্যমে করতে চাইলে কম টাকায় করা যাবে।’

এবার প্রথম দিন বিকাশ করা এক হাজার টাকার কথা উল্লেখ করেন প্রতিবেদক। ফলে আরো এক হাজার টাকা কমান হাবিব। সব মিলিয়ে ১৪ হাজার টাকায় রফা হয়। হাবিব বলেন, ‘ওই এক হাজার টাকা বাদে তাহলে আর ১৪ হাজার টাকা দিলেই হয়ে যাবে। আমি তো এখন ছুটিতে আছি। আবদুর রব আছে ডিউটিতে। রবকে আমি সব ব্যবস্থা করে রাখতে বলছি। কালকে রবকে টাকা দিয়ে মাল নিয়ে চলে যাইয়েন।’

হাবিবের কথামতো আবদুর রবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সকাল ৯টার ভিতরে চলে আসেন। এসে ফোন দিয়ে টাকা দিয়ে বসে থাকবেন বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এরপরে মাল নিয়ে আপনারা চলে যাবেন।’

যে লাগেজ নিয়ে এত দরকষাকষি, সেই লাগেজে কী ছিল চলুন জেনে নিই। মিনজু আক্তার জানান, ১২টি জায়নামাজ, ১১ কেজি খেঁজুর, চারটি খেলনা পুতুল, দুই জোড়া জুতা, বেশ কিছু চামচ,সাতটি বডি স্প্রে, একটি আয়রন মেশিন, একটি পুরাতন কম্বল, একটি কুকার, কিছু নতুন-পুরোনো জামা কাপড়সহ ছোটখাটো কিছু জিনিস ছিল ওই লাগেজে।

লাগেজ খালাস নিয়ে এই অবৈধ ব্যবসার কথা জানেন কি না জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমস হাউসের কমিশনার প্রকাশ দেওয়ান এনটিভি অনলাইনকে বলেন, এমন ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। মানুষের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির কাস্টমস এজেন্টরা (কাস্টম সরকার হিসেবে পরিচিত) এভাবে প্রতারণা করছে প্রতিদিন।

শত শত মানুষের প্রতারিত হওয়ার খবর জানার পরেও এর প্রতিকারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে এই কমিশনার বলেন, ‘এসব ব্যাপার সবাই জানে কিন্তু আমরা তো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি কখনো। লিখিত অভিযোগ পেলে তো আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। প্রয়োজনে আমরা তাদের লাইসেন্স বাতিল করে দেব।’

এ ব্যাপারে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ইমাম গাজ্জালি বলেন, সিঅ্যান্ডএফ কার্যালয়ে তিন ধরনের কর্মকর্তা থাকেন। এঁদের মধ্যে যাঁরা ছোট, তাঁদের উপার্জন স্বাভাবিকভাবেই কম। এরাই অবৈধ উপার্জনের পথে নামেন এবং তাঁদেরকে সম্পূর্ণ তথ্য দেন না।

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘ওই লাগেজ খালাস করতে কিছু টাকা যদি লাগেও তবে সেটা দু-চার হাজারের বেশি হবে বলে আমার মনে হয় না। এভাবে যারা মানুষকে হয়রানি করছে প্রতিনিয়ত, তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।’

ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ মোহাম্মদ ফরিদ বলেন, অ্যাসোসিয়েশনের কিছু কর্মকর্তা এসব অবৈধ পথে টাকা আয় করার চিন্তা করে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে চলেছে। শুধু এই একট ঘটনা নয়, প্রতিদিনই চলছে এসব। তিনি বলেন, ‘তবে দুঃখের বিষয় হলো আজ পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি আমার কাছে। ওই নিহতের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে আপনি একটা লিখিত অভিযোগ দেন। আমরা একটা দৃষ্টান্ত তৈরির চেষ্টা করব।’

মোহাম্মদ ফরিদ আরো বলেন, ‘এসব অবৈধ আয়ের পথে যে শুধু এজেন্টরা জড়িত তা কিন্তু নয়। এজেন্টরা এসব মালামাল পায় কোথায়? সারা পৃথিবী থেকে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে করে যে মালামাল আসে তার ক্যারিং এজেন্ট হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কাজ করে। আর বাংলাদেশ বিমানের লোকজন অসৎ উপায়ে আয় করার জন্য এসব এজেন্টদের দিয়ে এই কাজ করান।

Aviation News

সম্পাদক: তারেক এম হাসান
যোগাযোগ: জোবায়ের অভি, ঢাকা, ফোন +৮৮ ০১৬৮৪৯৬৭৫০৪
ই-মেইল: jobayerovi@gmail.com
যুক্তরাস্ট্র অফিস
ইউএসএ সম্পাদক: মো. শহীদুল ইসলাম
৭১-২০, ৩৫ অ্যাভিনিউ, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক ১১৩৭২
মোবাইল: +১ (২১২) ২০৩-৯০১৩, +১ (২১২) ৪৭০-২৩০৩
ইমেইল: dutimoy@gmail.com
এডিটর ইন চিফ : মুজিবুর আর মাসুদ ইমেইল: muzibny@gmail.com
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত এভিয়েশন নিউজবিডি.কম ২০১৪-২০১৬