একটি বেদনাদায়ক আকাশ ভ্রমণের কাহিনী

কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট, মালিন্দো এয়ার কাউন্টারের সামনে

কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট, মালিন্দো এয়ার কাউন্টারের সামনে

একটি ঝামেলা বিহীন বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে একটি ভাল ট্যুর প্ল্যান যেমন গুরুত্বপুর্ণ ঠিক তেমনি গুরুত্বপুর্ণ হল সেই প্ল্যান কে কার্যকর করার অনুকুল পারিপার্শ্বিক অবস্থা। আপনার দীর্ঘদিনের একটি সুন্দর পরিকল্পনা এক মুহূর্তে ভেস্তে দেয়ার জন্য একটি এয়ারলাইন এর জঘন্য সার্ভিসই যথেষ্ট। ঘটনা হলো আমাদের মালয়েশিয়া ট্যুরের প্ল্যান আমরা করেছিলাম কোনো এক কুরবানি ঈদের সময়। বিপুল উৎসাহে আমরা প্রায় দুই মাস আগে থেকে যাবতীয় প্ল্যান করে বসে আছি। টিকিট কাটা শেষ। টোটাল ছয় রাত সাত দিনের প্ল্যান। সময় কাজে লাগাতে ঈদের রাতেই রাত ১১ টায় ফ্লাইং টাইম নির্ধারিত করেছি।
যাই হোক, কুরবানির যাবতীয় কাজ সেরে আমরা যথাসময় এয়ারপোর্টে উপস্থিত। এয়ারপোর্টে পৌঁছে আমরা আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও আমাদের নির্ধারিত এয়ারলাইন এর কাউন্টারে কাউকে খুঁজে পেলাম না। ভাবলাম হয়ত আগে এসে পড়েছি, তাই। কিন্তু একি, সময় চলে যায় প্রায় দশটার কাছাকাছি তবুও কারো দেখা নেই। আমার কন্যা কিছুক্ষণ পর পর জিজ্ঞেস করে “মা আমরা প্লেনে উঠব কখন?” মহা যন্ত্রণা! ধীরে ধীরে সব যাত্রী এসে হাজির কিন্তু বিমানের স্টাফদের পাত্তা নেই। অবশেষে কানাঘুষায় শোনা গেল ওদের একটা ফ্লাইট বাতিল হয়েছে তাই আজ রাতে আর কোন ফ্লাইট নেই, এর আগের ফ্লাইটে যে কয়জন পেয়েছে তুলে দিয়ে এখন তারা ভয়ে গা ঢাকা দিয়ে আছে। ফ্লাইট বাতিল হলে যে তা আগে থেকে যাত্রীদের জানাতে হয় এই নুন্যতম কান্ডজ্ঞানও তাদের নেই। এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে জানানো হল। ম্যাজিস্ট্রেটের তৎপরতায় অবশেষে তাদের চাঁদ বদন প্রকাশিত হল আমাদের সামনে।
যাত্রীরা তো পারলে বেশ কয়েকটা উত্তমমধ্যম দিয়ে দেয় আর কি। এরই মধ্যে মিডিয়া চলে এসেছে। তারা আমাদের ছবি তুলতে ব্যস্ত। অনেক তর্কাতর্কি আলোচনার পর রাত দেড়টার দিকে তারা আমাদের উত্তরায় একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করবে বলে আশ্বস্ত করলো। কিন্তু অতো রাতে এতগুলো যাত্রীর জন্য ট্রান্সপোর্ট কোথায় পাবে? অবশেষে লক্কর ঝক্কর মার্কা হিউম্যান হলার হল আমাদের হোটেল যাত্রার বাহন। দুইটার দিকে আমরা যখন সেটাতে চড়ে বসছি তখন আমার কন্যার যুগান্তকারী প্রশ্ন “মা, এইটাই কি প্লেন ??!!” যাই হোক ঢাকার মধ্যে হোটেলে থাকার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। এদিকে আমাদের তো কুয়ালালামপুর থেকে লাংকাউইর প্লেনের টিকিট কাটা আছে। তবে অশেষভাগ্য যে সেই ফ্লাইট এক দিন পর তাই একদিন পরও যদি যাই তাহলেও ফ্লাইট ধরতে সমস্যা হবে না। কিন্তু আগামীকাল কখন ফ্লাইট হবে সেটা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেনা। বলেছে হোটেলেই থাকতে, যেকোনো সময় তারা ফোন করে আমাদের এয়ারপোর্টে নিয়ে যাবে।
আমরা ততক্ষণে এদের উপর পুরোপুরি ভরসা হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু করার নেই কিছুই অপেক্ষা করা ছাড়া। হোটেলে বলতে গেলে পুরোটা দিন বন্দি কারণ কখন তারা ফোন করবে কে জানে? অবশেষে বিকেল চারটার দিকে তারা বাস পাঠিয়ে নিয়ে গেল আমাদের। অতঃপর রাত এগারোটায় ছাড়ল আমাদের ফ্লাইট। প্ল্যান ছিল কুয়ালালামপুর একদিন এক রাত থেকে যাব লাংকাউই। কিন্তু সেটা মাত্র ৪ ঘন্টায় এসে ঠেকল। অবশেষে ৪ ঘন্টা পর লাংকাউইয়ের ফ্লাইট পাকড়াও করে অবশেষে এক দীর্ঘ হয়রানির পর আমাদের হল লাংকাইউ দর্শন। কি ভাবছেন যত ঝামেলার হল অবসান? না জনাব, এখনো অনেক বাকি।
প্ল্যান থেকে এক দিন অলরেডি কাটছাঁট হয়ে গেছে। কি আর করা বাকি দিনগুলি প্ল্যান মোতাবেক ঘুরে এবার ফেরার পালা। কিন্তু ভুলে গেলে তো চলবেনা যে আমাদের ফিরতি ফ্লাইটটাও যে একই এয়ারলাইন এরই। যথারীতি আবার রাতের ফ্লাইট, কুয়ালালামপুর থেকে পুত্রজায়া দর্শন করে একবারে এয়ারপোর্ট যাচ্ছি আমরা। এয়ারপোর্ট এর কাছাকাছি চলে এসেছি প্রায় এমন সময় ফোন। এবার তারা অত্যন্ত ভদ্র তাই ফ্লাইটের তিন ঘন্টা আগে জানাচ্ছেন যে আজকের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, এবং সেটা কাল রাতে যাবে। ঘোরাঘুরি, শপিং করে পকেট তো প্রায় গড়ের মাঠ। এর মধ্যে যদি আবার এক রাত থাকতে হয় তাহলে তো মহা বিপদ। তাছাড়া ছুটিও শেষ। কি আর করা আমরা সরাসরি তাদের সাথে দেখা করলাম। যেয়ে দেখি আবার সেই হুলস্থুল যাত্রীদের সাথে। এবার নিজেদের মাটিতে তাই তাদের ভাব অনেক বেশি। কিন্তু আইন অনুযায়ী তারা আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বাধ্য। তবে সেটাও তারা নিজে থেকে দিবে না, আমাদের আদায় করে নিতে হবে এমন অবস্থা।
যাই হোক, অবশেষে তারা আমাদের অর্থাৎ পুরো এক ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য কেএফসির কুপন আর হোটেলের ব্যবস্থা করল। বাসে করে নিয়ে গেল পুত্রজায়ার এক হোটেলে। প্ল্যানে ছিল না পুত্রজায়ায় থাকবো, সেটাও হয়ে গেল। পুরো একটা দিন থাকা খাওয়া ফ্রি। খারাপ কি? মহা আনন্দেই ঘুরলাম ফিরলাম । অতঃপর রাতে আবার এয়ারপোর্টে প্রত্যাবর্তন। আমরা এক বাসে আর লাগেজ অন্য বাসে। সেই লাগেজ যে কিভাবে খুঁজে পেয়েছিলাম তা আর এক কাহিনী, সেটাতে আর যাচ্ছি না। অনেক এ্যাডভেঞ্চার হয়েছে এ পর্যন্ত, ভাবলাম এবার বুঝি শেষ হলো। কিন্তু উপরওয়ালা তখনও মুচকি হাসছিলেন। পৌঁছে দেখি প্রায় একশ জনের লাইন চেক ইনের জন্য। ঘটনা কি? ঘটনা হলো ঈদ থেকে তাদের যে এক ফ্লাইটের সংকট শুরু হয়েছে সেই ঘাটতি তারা এখনো পূরন করতে পারেনি। তাই আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে প্লেনের সিট থাকা সাপেক্ষে যারা চেক ইন করতে পারবে তারা আজকে যেতে পারবে আর না হলে টা টা বাই বাই।
হোটেল আছে না? আমরা আর কথা না বাড়িয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ঠিক আমাদের আগে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি ছিলেন শেষ ভদ্রলোক যিনি টিকিট পেলেন। তারপর থেকে প্লেনের সিট ফুল। কাজেই আজও আমাদের যাওয়া হবেনা। কপাল খারাপ কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি! ততক্ষণে আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। পরদেশে আর কত? নিজ বাড়িতে ফেরার জন্য মন তখন আই ঢাই। ছুটি তো পার হয়েছে কবেই, চাকরি না বাঁচালে পরের ট্রিপ দিব কিভাবে? কাজেই যেভাবেই হোক, আজ যেতেই হবে। তারপরের ঘটনা ইতিহাস। অনেক তর্কাতর্কি, অনেক অনুরোধ, অনেক তোষামোদি। অতঃপর আমাদের সাথের বাচ্চাদের অবস্থা দেখে তাদের করুণা হলো। বিজনেস ক্লাশের ছয়টা সিট ফাঁকা ছিল, আমরা দুই ফ্যামিলি ছিলাম সদস্য সংখ্যা ছয়জন। শুধুমাত্র আমাদের সাথে বাচ্চা থাকায় তারা আমাদের শেষ মুহুর্তে সেই সিটগুলোতে আসার ব্যবস্থা করে দিলো।
এ যেন মেঘ না চাইতেই জল! ইকোনোমি ক্লাসের টিকিট করে বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণের সুযোগ। যদিও আমাদের তখন আর সেটা ভাবার অবস্থা ছিলনা। আমরা আশ্বাস পাওয়ার সাথে সাথে যখন বাক্স পেটরা নিয়ে আগালাম। এতো সহজে কখনো ইমিগ্রেশন পার হইনি আগে। তারা আমাদের কোনো চেক ই করলো না তেমন। সবাই উঠে গিয়েছে প্লেনে। আমরাই শেষ যারা প্লেনে উঠলাম দৌড়োতে দৌড়োতে এবং আমরা ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছেড়ে দিল প্লেন। অতঃপর প্রায় চার ঘন্টা উড্ডয়নের পর খুব ভোরে যখন প্লেনটি স্পর্শ করল স্বদেশের মাটি তখন বুক থেকে যেন এক তিনমণি পাথর নেমে গেল। শেষ হল আমাদের এক ঘটনাবহুল ট্যুর। এর পরে অনেক ভ্রমণই করেছি কিন্তু এমন ঘটনাবহুল তার কোনোটাই নয়। ও হ্যাঁ আমাদের এমন রোমাঞ্চকর, ঘটনাবহুল, বেদনাবিধুর ও থ্রিলিং ভ্রমণের পিছনে যাদের নিরলস পরিশ্রম ও ঘাম ঝরা অবদান সেই মহান আত্মত্যাগি এয়ারলাইন হল মালিন্দো এয়ার। দুইদিন আমাদের স্টার মানের হোটেলে রাখা এবং তিন বেলা খাবারের ব্যাবস্থা করার জন্য একটু ধন্যবাদ তারা মনে হয় পেতেই পারে (যদিও এটা আদায় করার পেছনে যাত্রীদের অবদান কম নয়) তবে এরপর থেকে এটাতে ভ্রমণ করলে তিন দিন ছুটি যে এক্সট্রা নিতে হবে এ ব্যাপারে সন্দেহ নাই কোনো।

সূত্রঃ প্রিয়ডটকম

Aviation News

সম্পাদক: তারেক এম হাসান
যোগাযোগ: জোবায়ের অভি, ঢাকা, ফোন +৮৮ ০১৬৮৪৯৬৭৫০৪
ই-মেইল: jobayerovi@gmail.com
যুক্তরাস্ট্র অফিস
ইউএসএ সম্পাদক: মো. শহীদুল ইসলাম
৭১-২০, ৩৫ অ্যাভিনিউ, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক ১১৩৭২
মোবাইল: +১ (২১২) ২০৩-৯০১৩, +১ (২১২) ৪৭০-২৩০৩
ইমেইল: dutimoy@gmail.com
এডিটর ইন চিফ : মুজিবুর আর মাসুদ ইমেইল: muzibny@gmail.com
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত এভিয়েশন নিউজবিডি.কম ২০১৪-২০১৬