নিয়ন্ত্রণহীন এজেন্সির কাছেই জিম্মি হজযাত্রীরা

এই লেখাটি 306 বার পঠিত

image-96560-1503253006প্রতিবছরের মতো এবারও নানা কারণে হজ ফ্লাইটের চরম বিপর্যয় ঘটেছে। মোয়াল্লেমের সঙ্গে এজেন্সিগুলোর বিলম্বে চুক্তি, সময়মতো বাড়িভাড়া না করা, ভিসা লজমেন্ট ও মোফা সেন্ড করতে বিলম্ব এবং ভিসাপ্রাপ্ত হজযাত্রীদের সৌদি পাঠাতে এজেন্সি মালিকদের টালবাহানা এ বিপর্যয়ের কারণ। এজন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
হজ অফিসের তথ্যানুযায়ী, এ বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ২০০ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ লাখ ২৩ হাজার হজযাত্রীসহ ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন বাংলাদেশির হজে যাওয়ার কথা। বেসরকারি হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ৬৩৫টি এজেন্সি। কিন্তু হজ এজেন্সিগুলোর ওপর সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় হজযাত্রীরা প্রতারণার শিকার হন।
এ বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, হজ অফিস ও বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরবে মোয়াল্লেমের সঙ্গে এজেন্সিগুলোর চুক্তি করতে বিলম্ব, বাড়িভাড়া করতে বিলম্ব, ভিসা লজমন্ট ও মোফা সেন্ড করতে বিলম্ব এবং ভিসাপ্রাপ্ত হজযাত্রী সৌদি আবর পাঠাতে বিলম্ব করায় হজ ফ্লাইটের বিপর্যয় ঘটেছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় ও হজ অফিস থেকে হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন করতে বারবার নির্দেশ দেওয়া হলেও এজেন্সি মালিকরা তা আমলে নেননি। তারা সরকারি সংস্থাগুলোর নির্দেশ না মানায় এবং তাদের ইচ্ছামাফিক কাজ করায় ভিসা ইস্যু ও হজযাত্রী পরিবহনে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ফলে হজযাত্রী সংকটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও সৌদি এয়ালাইনসের বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল হয়।
বিষয়টি স্বীকার করে হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) নেতারা জানান, চলতি বছর মোয়াল্লেম ফি বৃদ্ধি, হজযাত্রীদের জন্য মক্কা-মদিনায় বিলম্বে বাড়িভাড়া করা, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে হজ পালনকারীদের ২০১৭ সালে হজ পালনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২ হাজার রিয়েল ধার্য করা এবং হজযাত্রী প্রতিস্থাপনে বিলম্বের কারণে হজ ফ্লাইটের বিপর্যয় ঘটেছে। এতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও সৌদি এয়ারলাইনসের মোট ৩২টি ফ্লাইট বাতিল হয়।
বাড়ি ভাড়ায় বিলম্ব
১০ জুনের মধ্যে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের জন্য সৌদি আরবে বাড়িভাড়া সম্পন্ন করার কথা। অথচ ওই সময়ে বাড়িভাড়া করে মাত্র ১০ থেকে ১২টি এজেন্সি। অন্য এজেন্সিগুলো যথাসময়ে বাড়িভাড়া সম্পন্ন না করায় ১১ জুন জেদ্দার বাংলাদেশ হজ মিশন থেকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া। ওই চিঠি পাওয়ার পর ধর্ম মন্ত্রণালয় হজ এজেন্সিগুলোকে বাড়ি ভাড়া করতে চিঠি দেয়। চিঠি পেয়ে কিছু এজেন্সি মালিক সৌদি গিয়ে বাড়িভাড়া সম্পন্ন করলেও কিছু এজেন্সি বিষয়টিকে আমলে নেয়নি। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশি ৯১টি এজেন্সি মোয়াল্লেমের সঙ্গে চুক্তি করেনি। ফলে এসব এজেন্সির ১৮ হাজার ৪০০ হজযাত্রীর বাড়িভাড়া না হওয়ায় ভিসা ইস্যু হয়নি। এ কারণে ভিসা ইস্যুর ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
এজেন্সিগুলোর টালবাহানা
২০১৫ ও ২০১৬ সালের হজ পালনকারীদের মধ্যে যারা ২০১৭ সালে পালনে ইচ্ছুক, তাদের ভিসা নিতে দুই হাজার রিয়াল ধার্য করে সৌদি সরকার। হঠাৎ করে ধার্যকৃত এই অর্থ প্রদানে আপত্তি তোলেন হজ এজেন্সির মালিকরা। এতে কোনো একটি এজেন্সির ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ হজযাত্রীর নামে ভিসা ইস্যু হলেও সব হজযাত্রীর ভিসা একসঙ্গে ইস্যু না হওয়ায় ভিসাপ্রাপ্তদের সৌদি আরবে পাঠায়নি এজেন্সিগুলো। ফলে ভিসাপ্রাপ্ত ২০ হাজারের বেশি হজযাত্রী থাকা সত্ত্বেও হজযাত্রী না পাওয়ায় ২৯ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুইটি হজ ফ্লাইট বাতিল করা হয়। ভিসাপ্রাপ্ত হজযাত্রীদের জেদ্দা প্রেরণের বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা হাব নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন। কিন্তু বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এজেন্সিগুলো সাড়া দেয়নি। ভিসা থাকার পরও যেসব এজেন্সি মালিক তাদের হজযাত্রীদের সৌদি আরব পাঠায়নি, সেসব এজেন্সির তালিকা তৈরি করে হজ অফিস। তালিকায় ৩৭৭টি হজ এজেন্সির নাম উঠে আসে। তাদের নামে পর্যাপ্ত ভিসা থাকার পরও হজযাত্রীদের সৌদি আরব প্রেরণ না করায় সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনায় বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে বলে এক চিঠিতে উল্লেখ করেন হজ অফিসের পরিচালক।
ভিসা লজমেন্ট ও মোফা সেন্ড করতে বিলম্ব
মোয়াল্লেমের সঙ্গে চুক্তির পর হজযাত্রীদের জন্য বাড়িভাড়া সম্পন্ন করতে হয়। এর পরই ভিসা লজমেন্ট ও মোফা সেন্ড করতে হয়। বেশ কিছু এজেন্সি ভিসা লজমেন্ট ও মোফা সেন্ড করতে বিলম্ব করায় ভিসা ইস্যুতে জটিলতা তৈরি হয়। ভিসা লজমেন্ট ও মোফা সেন্ড করতে হজ অফিস থেকে একাধিকবার নির্দেশ দেওয়া হয় হজ এজেন্সিগুলোকে। এমনকি ৮ আগস্ট হজক্যাম্প পরির্দশনে গিয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান হজ ফ্লাইট বাতিলের জন্য এজেন্সি মালিকদের দায়ী করেন। তিনি হজযাত্রীর জন্য লজমেন্ট করেনি এমন ২৮টি হজ এজেন্সিকে ভিসার জন্য লজমেন্ট করতে দুই দিনের সময়সীমা বেঁধে দেন এবং বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে ভিসার জন্য লজমেন্ট করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে জানান। কিন্তু এসব নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি এজেন্সি ভিসা লজমেন্ট করলেও কিছু এজেন্সি নির্দেশনা আমলে নেয়নি। এর পর ১৩ আগস্ট হজ অফিসের পরিচালকের দপ্তর থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, ১৬টি এজেন্সি মালিক তাদের হজযাত্রীদের মোফা সেন্ড করেননি এবং ডিও লেটারের জন্য আশকোনার হজ অফিসে আবেদন করেননি। এ কারণে সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনায় বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে।

জানা গেছে, হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। প্রতিবছরই এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে হজযাত্রীদের জন্য নিম্নমানের লাগেজ ক্রয়, মক্কা-মদিনায় বিলম্বে বাড়ি ভাড়া করা, নির্ধারিত দূরত্ব থেকে দূরে এবং নিম্নমানের বাড়ি ভাড়া করা, ঠিকমতো খাবার না দেওয়া, চুক্তিহীন বাড়িতে গাদাগাদি করে হজযাত্রীদের রাখা, দেরিতে মোয়াল্লেম নেওয়া, হজযাত্রীদের খোঁজখবর না নেওয়া ও যথাসময়ে বিমানের টিকিট সংগ্রহ না করাসহ অভিযোগের পাহাড় রয়েছে।

Aviation News