শাহজালালে পদে পদে হয়রানি

এই লেখাটি 247 বার পঠিত

Bd-pratidin-06-07-17-F-01শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, আর্মড পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৈঠক, যৌথ কর্মপরিকল্পনা, দ্রুত কাজ বাস্তবায়ন, একসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি তৎপরতা গড়ে ওঠেনি আজ অবধি। অন্যদিকে বিমানবন্দরে প্রবেশ এবং বের হওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানামুখী সমস্যা। অথচ শাহজালালের থেকেও বিশ্বের অনেক ছোট বিমানবন্দর পরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজানোর কারণে সেগুলো সফলতা নিয়ে কাজ করছে। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের লাগোডিয়া বিমানবন্দর, শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েক বিমানবন্দর, মালদ্বীপসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিমানবন্দর শাহজালালের চেয়ে কম পরিসরের জমিতে নির্মিত। তারপরও সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকার কারণে সেখানকার প্রতিটি কাজ পরিকল্পিত এবং গোছানো। শাহজালালে ঠিক তার বিপরীত চিত্র। নিয়মিত বিমানভ্রমণ করেন এমন একজন ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, কয়েক বছর আগেও কলকাতা বিমানবন্দর ছিল আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এখন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশ্বমানের একটি বিমানবন্দরে পরিণত হয়েছে। সেখানে ইমিগ্রেশন অতিক্রম করার পরেই লাগেজ বেল্টে এসে যায়। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরেও একই অবস্থা। মালদ্বীপের ছোট্ট একটি দ্বীপের মধ্যে বিমানবন্দরে বোর্ডিং ব্রিজও নেই কিন্তু তারপরও পুরো ঝকঝকে-তকতকে পরিবেশ। অথচ শাহজালাল বিমানবন্দরের কোনো স্থানের সিলিংয়ের বোর্ড খসে পড়েছে। যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায় ইঁদুর আর বিড়াল। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ যাত্রীসহ বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্টরা। জেএফকে, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই সব বিমানবন্দরে বিজনেস ক্লাস যাত্রীদের জন্য আলাদা লাইন রয়েছে। শাহজালালে তাও নেই। এমনকি দেশে ফেরার সময়ও বিজনেস ক্লাস যাত্রীরা মালামাল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পান না। লাগেজ ভোগান্তি শাহজালালে ভয়াবহ। অনেক সময় প্লেন থামার এক ঘণ্টা পর বেল্টে মালামাল আসা শুরু হয়। যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

তবে বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন আর সেই আগের অবস্থা নেই। যাত্রীরা এখন ৪০ মিনিটের মধ্যেই তাদের লাগেজ হাতে পেয়ে যান। কখনো কখনো এর ব্যত্যয় ঘটতে পারে। সব সময় নয়।

গ্রিন-রেড চ্যানেল যেন মাছবাজার : দুনিয়ার কোথাও কাস্টমসের গ্রিন ও রেড চ্যানেলের ভিতর মানি এক্সচেঞ্জ নেই। কিন্তু শাহজালালে আছে। তারা মাছের বাজারের মতো যাত্রীদের টানাটানি করে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। এর মধ্যে নতুন করে আরও দুটি এক্সচেঞ্জ বসানো হয়েছে। এতে বিশৃঙ্খলা চরম আকার ধারণ করেছে। তাদের এই টানাটানিতে যাত্রীরা বিরক্ত হলেও এগুলো ঠেকানোর কেউ নেই। এই এক্সচেঞ্জ পয়েন্টে এলে বোঝার উপায় নেই এটা একটি দেশের প্রধান বিমানবন্দর।

ইমিগ্রেশন ভোগান্তি : কলকাতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছতে মাত্র ৪০ মিনিট লাগলেও এখানে ইমিগ্রেশনে ব্যয় হয় এক ঘণ্টারও বেশি সময়। বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহ করে রওনা দিতে লেগে যায় আরও এক ঘণ্টা। এ ছাড়া যাত্রীদের এই লাগেজ সংগ্রহ সিস্টেম চলছে সেই পুরনো আমলের। আধুনিকায়নের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে ব্যাগ পেতে যাত্রীদের এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এরপর গ্রিন চ্যানেল পার হতে টানাটানি শুরু করে মানি এক্সচেঞ্জের লোকজন। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের যে কোনো স্থান থেকে শাহজালালে নেমেই যাত্রীদের এমন হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিট নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করতে গিয়ে কোথাও কোনো অসুবিধা না হলেও নিজ দেশের শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিটি এজেন্সির জেরার মুখে পড়তে হয়। কেন বিদেশ গেছেন, সঙ্গে এত কিছু এনেছেন কেন, এত বড় লাগেজ যখন বহন করছেন তখন আমাদেরও কিছু দিয়ে যান— এমন সব বায়না আর উদ্ভট প্রশ্ন মোকাবিলা করেই তাদের বিমানবন্দর থেকে বের হতে হয়।

বিজনেস ক্লাসের পৃথক লাইন নেই : শাহজালালে লাগেজ হ্যান্ডেলিং নিয়ে সেই পুরনো সমস্যার এখনো কোনো সমাধান হয়নি। এ নিয়ে যাত্রীদের নানা অভিযোগ থাকলেও নিয়ম শৃঙ্খলায় আসতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সারা দুনিয়ায় বিজনেজ ক্লাসের যাত্রীরা আগে লাগেজ পেলেও বাংলাদেশে এর উল্টো। বিজনেস ক্লাসের যাত্রীরা তাদের মালামাল পাচ্ছেন অনেক দেরিতে। সেক্ষেত্রেও ওই যাত্রীরা নানামুখী হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে আসা শামীম আহমেদ নামে এক বিজনেস ক্লাসের যাত্রী অভিযোগ করেন, তিনি আধা ঘণ্টা ধরে কনভেয়ার বেল্টে দাঁড়ানো। কিন্তু লাগেজ আসেনি। তিনি কাস্টমস লাগোয়া সারিবদ্ধ চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছিলেন। মুহূর্তেই ভন ভন শুরু করে মশারা। এরপর শুরু হয় তাদের কামড়।

ইঁদুর-বিড়াল-মশা-মাছি : বিমানবন্দর ব্যবহারকারী যাত্রীরা জানায়, মশা ছাড়াও ইঁদুর বিড়ালের অত্যাচারও রয়েছে। এ নিয়ে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে ইঁদুর-বিড়ালের দৌড়ঝাঁপের দৃশ্য কল্পনাতীত হলেও শাহজালালে এটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

পরিত্যক্ত উড়োজাহাজের ছড়াছড়ি : বিমানবন্দরের রানওয়ে এখন যেন পুরনো ও পরিত্যক্ত উড়োজাহাজের ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে। সেগুলো সরানো বা মেরামত করানোর কোনো ব্যবস্থা নেই কর্তৃপক্ষের। জিএমজি, ইউনাইটেডসহ বিভিন্ন এয়ারলাইনসের বিকল উড়োজাহাজ সেখানে ফেলে রাখা হয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, রানওয়ের উত্তর দিকে এয়ার ফ্রেইট গুদামের কাছে ৮ থেকে ১০টি বিকল উড়োজাহাজ পড়ে আছে। সিভিল এভিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ইতিমধ্যে বিকল উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে ফেলতে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসকে বলা হয়েছে।

 

Aviation News