নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কান্না

এই লেখাটি 585 বার পঠিত

15984প্রবাস জীবনের একঘেঁয়েমি কাটাতে ঈদ ও গ্রীষ্মের ছুটিতে মাতৃভূমিতে বেড়াতে যাবার বাসনা নিয়ে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিন দেশে যাচ্ছেন শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি। ‘অনন্য সেবার প্রতিশ্রুতি এবং বিমানবন্দর থেকে ফেরত না আসার নিশ্চয়তা’ দিয়ে প্রবাসীদের কাছে এয়ার টিকেট বিক্রি করা বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসেস হঠাত্ করেই লাপাত্তা হয়ে গেছে। যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও এয়ারলাইন্সের বুকিং বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে দেশে যেতে না পেরে বিমানবন্দরে অনেকেই ভেঙে পড়ছেন কান্নায়। কেবলমাত্র আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার কারণেই তাদের এই কান্না নয়, এই কান্না দেশ ও স্বজনদের কাছে যেতে না পারার বেদনার বহিঃপ্রকাশ। অনেক প্রবাসী রয়েছেন, যারা দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পর দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন। আবার অনেকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি মালিকানাধীন ট্রাভেল এজেন্সি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসেস।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাজমুল হুদার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উপজেলায়। তিনি সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী নূরুল হুদার আপন ভাই। বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা-নিউইয়র্ক রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য তত্কালীন বিমানের একমাত্র ট্রাভেল এজেন্ট ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের মালিক এই নাজমুল হুদাকেই এখনো দায়ী করেন প্রবাসীরা। প্রতিমন্ত্রী ভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে তিনি কৌশলে বিমানের টিকেট অবিক্রিত রেখে বিমানকেই অব্যাহত লোকসানের মুখে ফেলেন।

আনডকুমেন্টেড প্রবাসীদের বৈধ করার নামে ইমিগ্রেশনের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি এবং তাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এফবিআই গ্রেপ্তার করেছিল নাজমুল হুদাকে। এফবিআই’র মামলায় তিনি আদালতে দোষী সাব্যস্তও হয়েছিলেন।

বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসেস-এর সবকটি শাখাই বন্ধ রয়েছে। জনরোষ এড়াতে অফিসের কর্মকর্তারা গা ঢাকা দিয়েছেন। কয়েকজনের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নাজমুল হুদা তাদের বিপদে ফেলে পালিয়েছেন। ঈদের আগে তাদের বেতন পর্যন্ত পরিশোধ করেননি তিনি। তারা জানান, প্রতিটি টিকেট বিক্রির অর্থ প্রতিদিন নাজমুল হুদা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, শুধু বাংলাদেশে যাবার এয়ার টিকেট নয়, ইতিমধ্যে যারা দেশে পৌঁছেছেন তাদের অধিকাংশেরই নিউইয়র্কের ফেরার টিকেট বাতিল করেছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেলস। ফলে নিউইয়র্কে ফিরতেও তাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে।

একাধিক সূত্র জানায়, গত প্রায় ছয় মাস ধরে নগদ অর্থে অস্বাভাবিক কমমূল্যে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের টিকেট বিক্রি করে আসছিল ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেলস। গত ছয় মাসে কমপক্ষে তারা দুই হাজার এয়ার টিকেট বিক্রি করেছেন।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসেস-এর মালিক নাজমুল হুদা সম্প্রতি নিজেকে দ্বিতীয় দফায় দেউলিয়া (ব্যাংক্রাপসি) ঘোষণা করেছেন। তবে আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হলে আদালত প্রমাণসাপেক্ষ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণা করে থাকে। কিন্তু নাজমুল হুদা দেউলিয়া হিসাবে স্বীকৃতি পাবার আগেই পরিকল্পিতভাবে দুই হাজারেরও বেশি এয়ার টিকেট বিক্রির মাধ্যমে প্রায় দুই মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে নাজমুল হুদার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে এসএমএস-এর মাধ্যমে এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে নাজমুল হুদা উত্তরে জানান, তিনি গত রবিবার থেকে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। তবে কিছু লোকের এয়ার টিকেট বুকিং নিয়ে সমস্যা হয়েছে বলে জানতে পেরেছেন। তিনি দাবি করেন, তার জ্যাকসন হাইটসের অফিসের ম্যানেজার সুমন লাপাত্তা। অফিস খোলার কেউ নেই। সুস্থ হলে এ ব্যাপারে একটি সমাধানে পৌঁছাবেন বলে জানান। তবে দুই হাজার যাত্রীর বুকিং সমস্যা হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, এই সংখ্যা ৩০-৪০ হতে পারে। তাদের মধ্যে যারা জুলাইয়ের শেষে ও আগস্টে দেশে যাবেন তাদের এই সমস্যা হয়েছে।

জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশি বিজনেস এসোসিয়েশনের (জেবিবিএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ জানান, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেলস জেবিবিএর সদস্যভুক্ত। অনেকেই টিকেট নিয়ে তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে আসছেন। জেবিবিএ’র কার্যকরী কমিটির পরবর্তী সভায় এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।

Aviation News