রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা দরকার

base_1495654050-4আনিস এ খান। দেশের ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। রয়েছেন বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদেও। ব্যাংকের আমানতের সুদহার, বিনিয়োগ, পুঁজিবাজার, খেলাপি ঋণ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দুর্দশাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনই।
দেশের বাইরে বড় দুটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করে এলেন। সেগুলোর অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন।
সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ স্কুল মিলনায়তনে বাংলাদেশ বিষয়ে দুই দিনব্যাপী সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ‘করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড হেলথ’-এর সহায়তায় ‘ইন্টারন্যাশনাল সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট, এ সেমিনারের আয়োজন করে, যেখানে দেশের বিভিন্ন খাতের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিরা অংশ নেন। সেমিনারে মূলত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির ১৭টি গোল এবং ১৬৯টি টার্গেটে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন, তা পর্যালোচনা হয়েছে। সেখানে বিশ্বের খ্যাতিমান অধ্যাপক ও নীতিনির্ধারকরা এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে আমাদের দেশ অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বলে তারা স্বীকৃতি দিয়েছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন।
অন্য যে সেমিনারে অংশ নিয়েছি, সেটি ছিল বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আয়োজনে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে ওই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি দেড়-দুই বছর পর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এ ধরনের আয়োজন করে থাকে। এবারের সেমিনারে মূলত ব্রেক্সিটের কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বেশি। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির নিরাপত্তা ইস্যু নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা ছিল।
ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমিয়েই যাচ্ছে। এতে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এমনটি হওয়ার কারণ কী?
একটি দেশে বিনিয়োগ করার জন্য মানুষের কাছে বিভিন্ন ধরনের খাত থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ এত দিন ধরে শুধু ব্যাংকে টাকা রেখে মুনাফা পাওয়ার প্রত্যাশা করতেন। এজন্য দেশে ব্যাংক আমানতের সুদহার বেশি ছিল। কিন্তু আমানতকারীদের যদি ১০ শতাংশ করে সুদ দিই, তাহলে উদ্যোক্তাদের কত শতাংশ সুদে ঋণ দেব? আমানতকারীদের ১০ শতাংশ সুদ দিয়ে তো অন্যজনকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারি না। এটি হলে তো ব্যাংকের ব্যবসা লাটে উঠবে।
আগে মূল্যস্ফীতির হার উচ্চ ছিল, ফলে বাংলাদেশে আমানতের সুদহার সারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ ছিল। আমানতে ১২-১৩ শতাংশ সুদ আর ঋণে ১৮-২০ শতাংশ সুদ বর্তমান বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে যায় না। ঋণের সুদহার কমানোর জন্যই আমানতের সুদহার কমানো হয়েছে। ব্যাংকগুলো এখন ৯ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দিচ্ছে। এটি আগে কল্পনাই করা যায়নি। ঋণের সুদহার কমার কারণে মানুষ এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরি করছে। গাড়ি, মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, এসি, টেলিভিশন কিনতে পারছে। এ কারণে দেশের অর্থনীতিতে গতি এসেছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা আমদানিনির্ভর পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করছেন।
ব্যাংকে টাকা রেখে লাভ হচ্ছে না, পুঁজিবাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে, সঞ্চয়পত্রের সুদহারও কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় মানুষ টাকা রাখবে কোথায়?
অন্যান্য দেশে মানুষ পুঁজিবাজার, ডেরিভেটিভস, লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো আধুনিক খাতগুলোয় বিনিয়োগ করে। সব জায়গায় আমি দেখেছি, মানুষ ১০০ টাকা থাকলে চার ভাগ করে ২৫ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে ব্যাংকে রাখে। ২৫ টাকা শেয়ারবাজারে, ২৫ টাকা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে, ২৫ টাকা ডেরিভেটিভসে বিনিয়োগ করে। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ ১০০ টাকার পুরোটাই ব্যাংকে জমা রেখে নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকে। এভাবে বেশি দিন চলতে পারে না। আমি মনে করি, বাংলাদেশেও এখন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর উচিত ভালো ভালো প্রডাক্ট আনা। ব্যাংকাসুরেন্স প্রডাক্ট এখন দেশে নিয়ে আসা দরকার বলে আমি দীর্ঘদিন বলে আসছি। ভালো মার্চেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে জেনে বুঝে ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
ঋণের সুদহার কমানো সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোয় অলস টাকার পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ছে না কেন?
আমানতের সুদহার কমে যাওয়ার কারণে মানুষ ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী ও নিজের নামে সঞ্চয়পত্র কেনা শুরু করেছে। ফলে সরকার চাহিদার অতিরিক্ত টাকা সঞ্চয়পত্র থেকে পেয়ে গেছে। তাই ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার টাকা নিচ্ছে না। এটি অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টির অন্যতম কারণ। দেশে এখন ব্যাংক আছে ৫৭টি। কিন্তু সিমেন্ট, রড, ভারী শিল্পের প্রতিষ্ঠান আছে কয়টি? ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের জায়গা তো থাকতে হবে। দ্রুত উন্নয়নের জন্য একটি দেশকে জিডিপির ৩২ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে ২৫-২৬ শতাংশ বিনিয়োগ হচ্ছে। এটি যথেষ্ট নয়।
খেলাপি ঋণ লাগামহীন গতিতে বাড়ছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?
খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে ভালোভাবে গবেষণা করা দরকার। জরিপ করে বের করা দরকার কেন গ্রাহক খেলাপি হচ্ছেন। উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ সংযোগ দেরিতে পেয়েছেন, গ্যাস সংযোগ বন্ধ হয়ে গেছে, কাঁচামাল খারাপ আসছে, নাকি যোগ্য ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান বা শ্রমিক পাননি বলে খেলাপি হয়েছেন। এ বিষয়গুলো খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে। অন্যথায় খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা কঠিন হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দুর্দশা লাঘবে কি করা দরকার?
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো আমাদের সম্পদ। এখনো এ ব্যাংকগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা আছে। বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও বৃহৎ জনবল নিয়ে এ ব্যাংকগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তবে সমস্যা থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে একীভূত করতে হবে। ইতিপূর্বে আমরা অর্থমন্ত্রীকে এ বিষয়ে বলেছি। সুন্দর একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে রাষ্ট্রায়ত্ত সবক’টি ব্যাংক একীভূত করে দুটি ব্যাংকে রূপান্তরিত করা যেতে পারে। পৃথিবীর প্রতিটি বড় ব্যাংকের ইতিহাসে একীভূত হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। সরকারি খাতে শক্তিশালী দুটি ব্যাংক থাকলে তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা সহজ হবে।
একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা বিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন। এটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে আমি আশা রাখব, বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যথাযথ ভূমিকা রাখবে।
ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির নেতৃত্বে আছেন। এটি কেমন উপভোগ করছেন?
ইন্ডিয়ান ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব প্রধান কার্যালয় ভবন আছে। সারা দেশে তাদের অনেকগুলো শাখা সংগঠনের কার্যালয় আছে। কিন্তু আমাদের একটি অফিস থাকলেও কোনো স্টাফ নেই। ভালো বেতন দিয়ে একজনকে নির্বাহী সচিব করব, এমন অর্থের সংস্থান আমাদের নেই। আমাদের এবিবি মূলত চেয়ারম্যানকেন্দ্রিক পরিচালিত হয়। তবে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের সম্মানের সঙ্গে মূল্যায়ন করে। ব্যাংকগুলোও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কিছু চাওয়ার জন্য আমার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী হিসেবে প্রায় আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। আপনার ব্যাংকের বিষয়ে বলুন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে আমি একটি চমত্কার ও প্রফেশনাল বোর্ড পেয়েছি। ব্যাংকটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ আট বছর ধরে তারা আমাকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। আমি কোনো উদ্যোগের কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে বোর্ডের পক্ষ থেকে উত্সাহ পেয়েছি। ২০০৯ সালে আমি যখন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে যোগদান করি, তখন ব্যাংকটির শাখা ছিল ৩৬টি। সে ব্যাংকের এখন ১১১টি শাখা, তিনটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি, ২৫০টি এটিএম বুথ, প্রায় তিন হাজার পস মেশিন, ২৩টি এজেন্ট ব্যাংকিং সেন্টার, অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট, স্ট্রাকচারড ফিন্যান্স ইউনিট ও নিজস্ব একাধিক ভবন হয়েছে। এমটিবি শুধু মুনাফার পেছনে ছোটেনি। এ ব্যাংক থেকে যাতে ভবিষ্যতে বিশ্বমানের ব্যাংকার তৈরি হয়, সেজন্য আমি নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছি। সব মিলিয়ে আমি এক্সাইটেড।

Aviation News

সম্পাদক: তারেক এম হাসান
যোগাযোগ: জোবায়ের অভি, ঢাকা, ফোন +৮৮ ০১৬৮৪৯৬৭৫০৪
ই-মেইল: jobayerovi@gmail.com
যুক্তরাস্ট্র অফিস
ইউএসএ সম্পাদক: মো. শহীদুল ইসলাম
৭১-২০, ৩৫ অ্যাভিনিউ, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক ১১৩৭২
মোবাইল: +১ (২১২) ২০৩-৯০১৩, +১ (২১২) ৪৭০-২৩০৩
ইমেইল: dutimoy@gmail.com
এডিটর ইন চিফ : মুজিবুর আর মাসুদ ইমেইল: muzibny@gmail.com
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত এভিয়েশন নিউজবিডি.কম ২০১৪-২০১৬