তিন দশকের পুরনো অর্গানোগ্রামে চলছে সিভিল এভিয়েশন

এই লেখাটি 317 বার পঠিত

200px-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6_%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%95_%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8_ত্রিশ বছরের পুরানো অর্গানোগ্রাম দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সিভিল এভিয়েশন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ থাকা সত্ত্বেও গত সাত বছর ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রস্তাবিত নতুন অর্গানোগ্রাম। সব কিছু চূড়ান্ত থাকার পরও কেন এত বছর ধরে ঝুলে আছে এ প্রস্তাব- সিভিল এভিয়েশন তার ব্যাখ্যাও দিতে পারছে না। বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ও নিশ্চয়তা দিতে পারছে না- কবে নাগাদ নতুন অর্গানোগ্রাম অনুমোদন পাবে। যদিও মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন জোর দিয়েই বলেছেন, এটা হতেই হবে। আমরা চেষ্টা করছি, দ্রুত সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে।
তিন দশকের পুরনো অর্গানোগ্রাম দিয়ে দেশের বিমানবন্দরের যাত্রীদের সেবার মানও রয়েছে সেই মান্ধাতা আমলের মতোই। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কর্মচারীরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল না থাকায় যাত্রীদের সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জনবলের অভাব যে কতটা প্রকট তার প্রমাণ মেলে, স্ক্যানার মেশিনের কাছে ডিউটি করার সময়। এক শিফটে একজন ডিউটি করতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। তাকে টয়লেটে যেতে হলে, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অন্য সেকশানের লোক ধার করে এনে বসিয়ে রেখে যেতে হয়। তখন কিছু লাগেজ আনচেকড যে পার হয় না- সে নিশ্চয়তা দিতে পারছে না কেউ।
সিভিল এ্যাভিয়েশনের একাধিক পরিচালক জানান-অর্গানোগ্রাম নবায়ন করা যে কতটা জরুরী, এটা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের বোঝাতে গলদঘর্ম হতে হয়। তারপরও তারা এটার প্রতি উদাসীন। অথচ তারা ভাল করেই জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এ্যাভিয়েশন অথরিটি (এফএএ) বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) দ্বিতীয় ক্যাটাগরির নিয়ন্ত্রণ সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে ২০০৯ সালে। সে সময় বেবিচকের ক্যাটাগরি-১-এ উন্নীত হওয়ার প্রধান শর্ত ছিল পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছরেও নিজস্ব জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) চূড়ান্ত করতে পারেনি বেবিচক। উপরন্তু পুরনো যে জনবল কাঠামো তাতেও ৫১৮টি পদ এখনও শূন্য আছে। প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব যে কতটা প্রকট সেটা বিমানবন্দরে গেলেই উপলব্ধি করা যায়। আজ নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ব্রিটিশ নিরাপত্তা কোম্পানি রেডলাইন শাহজালাল বিমানবন্দরের কাজ তদারকি করছে। তার অন্যতম কারণ, দক্ষ জনবলের অভাব। শুধু এই অজুহাত দেখিয়েই যুক্তরাজ্য একের পর এক শর্ত দিয়ে যাচ্ছে। যদি অর্গানোগ্রামের অনুমোদনের ফাইল মন্ত্রণালয়ে ঝুলে না থাকত, যদি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে তাদের প্রশিক্ষিত করে দায়িত্ব দেয়া হতো- তাহলে রেডলাইন আসার সুযোগ পেতো না।
নিজস্ব অর্গানোগ্রাম না থাকায় এফএএর তালিকায় ক্যাটাগরি-১-এ উন্নীত হতে পারছে না বেবিচক। আর ক্যাটাগরি-২-এ থাকায় বেবিচক থেকে অনুমোদন নেয়া সংস্থার উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশকিছু দেশে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পাচ্ছে না। একই কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া কোন উড়োজাহাজেরও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি নেই। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বহুল প্রতীক্ষিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিউইয়র্ক রুটের ফ্লাইটও চালু করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে সিভিল এ্যাভিয়েশনের প্রশাসন শাখা জানিয়েছে-বর্তমান অর্গানোগ্রাম ১৯৮৫ সালের তৈরি। তখন দেশে শুধু মাত্র একটা এয়ারলাইন্স বিমান ও হাতেগোনা কয়েকটা বিদেশী এয়ারলাইন্স ছিল। তখন বার্ষিক যাত্রী ছিল মাত্র দশ লাখ। তিন দশকে আজ শুধু দেশীয় এয়ারলাইন্সই রয়েছে ৫টি। এখন শুধু শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়েই বছরে ষাট লাখেরও বেশি যাত্রী সুবিধাভোগ করে। এ দুটো পরিসংখ্যানের আলোকেই বর্তমান জনবল থাকাটা আবশ্যক। অথচ এর বিপরীতে- চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ রয়েছে ৩ হাজার ৭১৬টি। জনবল-সংক্রান্ত গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির প্রথম শ্রেণীর অনুমোদিত পদের সংখ্যা ২৭১- যার মধ্যে ৩০টি বর্তমানে শূন্য। দ্বিতীয় শ্রেণীর ১১৮টি অনুমোদিত পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ১৪টি। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণীর ২৪১৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৪০৬টি ও চতুর্থ শ্রেণীর ৯১৪টি পদের মধ্যে শূন্য ৬৮টি পদ। এ সব পদ পূরণও করা যাচ্ছে না। নতুন অর্গানোগ্রামের অপেক্ষায় শূন্য পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্যই রয়ে গেছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সিভিল এ্যাভিয়েশনের এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেবিচকে জনবল সঙ্কট দীর্ঘদিনের। দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী দেশী-বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর পাশাপাশি সবগুলো বিমানবন্দরও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বেবিচকের। কেবল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন দেশের চারটি এয়ারলাইন্স সংস্থার প্রায় ৫০টি ফ্লাইট পরিচালিত হয়। পাশাপাশি ১৮ দেশের ২৫টি এয়ারলাইন্স সংস্থার প্রায় ১০০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও পরিচালিত হয় এ বিমানবন্দর দিয়ে। এ অবস্থায় জনবল সঙ্কটের কারণে এসব কার্যক্রম প্রায়ই দুর্বল নজরদারির মধ্যে থেকে যাচ্ছে। আবার বাণিজ্যিক ফ্লাইটের পাশাপাশি দেশে বর্তমানে নয়টি কোম্পানি ১৮টি হেলিকপ্টার পরিচালনা করলেও এসব পর্যবেক্ষণে ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর রয়েছেন মাত্র একজন। ফলে এতগুলো হেলিকপ্টার সবসময় নজরদারির মধ্যে রাখা সম্ভব হয় না বেবিচকের পক্ষে। সম্প্রতি কক্সবাজারে ক্রিকেটার সাকিবকে বহনকারী হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা তদন্তে ফ্লাইট অপারেশন শাখার দৈন্যদশা ফুটে ওঠে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় হেলিকপ্টার সংস্থাগুলোর অনেক কাজই তদারকি সম্ভব হচ্ছে না। শুধু হেলিকপ্টার নয়, বিমানসহ অন্যান্য এয়ারলাইন্সগুলো সিভিল এ্যাভিয়েশন রুলস রেগুলেশন ঠিক মতো মেনে চলছে কিনা সেটাও নিয়মিত তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সময়োপযোগী অর্গানোগ্রাম না থাকায় কি ধরনের সঙ্কট মোকাবিলা করতে হচ্ছে জানতে চাইলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, এখন যেভাবে বিভিন্ন বাহিনী, যেমন আনসার, পুলিশ, এপিবিএন, এয়ারফোর্স থেকে ধারকর্জ করে লোকজন এনে কাজ চালানো হচ্ছে, এভাবে কোন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট চলতে পারে না। এয়ারপোর্টে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবা ঠিক মতো দেয়া যাচ্ছে না। ১৯৮৫ সালের দেশের এ্যাভিয়েশন খাতের আকার যে পরিমাণ এখন তার দশগুণ বাড়লেও জনবল কাঠামো রয়ে গেছে তেমনই। জোড়াতালি দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যা দেখলে- আইকাও আপত্তি জানাবে। যে কারণে একজন শ্রমিককে ইচ্ছের বাইরে অসুস্থ শরীর নিয়েও ওভার টাইম করতে হয়, নিজের ডিউটির সময় অন্যকে দাঁড় করিয়ে রেখে টয়লেটে যেতে হয়, কারিগরির কাজ করতে হয় কেরানি দিয়ে, সিনিয়রের কাজ করতে হয় জুনিয়র দিয়ে, নিরাপত্তার কাজ হয় ক্লিনার দিয়ে। এক কথায় বলতে গেলে-ত্রিশ বছরের পুরনো অর্গানোগ্রাম দিয়ে এখন খুঁড়িয়ে চলছে সিভিল এ্যাভিয়েশন। এতে সিভিল এ্যাভিয়েশন দিনদিন দুর্বল হয়ে স্বকীয়তা হারাচ্ছে। এ জন্য শুধু হজরত শাহজালাল নয়-দেশের সব কটা বিমানবন্দরই এখন চলছে বেহাল অবস্থায়।
জানতে চাইলে বেবিচকের সদস্য (অপরেশন) এয়ার কমোডর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জনবল সঙ্কট দূর করতে বেবিচকের নিজস্ব অর্গানোগ্রাম তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে পুরনো অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী শূন্য পদগুলোয়ও জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বেবিচক মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন থেকে প্রাথমিক অনুমোদন পেয়ে সেটা আবার সিভিল এ্যাভিয়েশনে ফেরত এসেছে। এখন চলছে নিয়োগ বিধি তৈরির কাজ, পদগুলো সব ঠিকঠাক আছে তা খতিয়ে দেখা ও কিছু পর্যবেক্ষণ তৈরি করা। এগুলো চূড়ান্ত করে পাঠানো হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। পরে সেখান থেকে যাবে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে। এ জন্য কিছু সময় লাগবে।
এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঁচ হাজার জনবলের চাহিদা দেয়া হলেও সবদিক যাচাই, বাছাই করে দুই হাজারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, বেবিচকের সব ধরনের কার্যক্রম ডিজিটাল করতে হবে। দাফতরিক কাজে কাগজের পরিবর্তে ই-ফাইলিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এজন্য বেবিচকে একটি আইসিটি বিভাগ খোলার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বেবিচকের প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ডাটাবেজ (তথ্যভা-ার) তৈরির বিষয়টি অর্গানোগ্রামে উল্লেখ করা হয়েছে। যেন কর্মচারীদের যাবতীয় কার্যক্রমে তথ্য সংগ্রহে রাখা যায়। নিয়ম অনুযায়ী নতুন অর্গানোগ্রামের নিয়োগবিধি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসাপেক্ষে সচিব কমিটিতে পাঠানো হবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দফতরে যাবে। প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিলেই দুই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করবে সিভিল এ্যাভিয়েশন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কবেনাগাদ সব ধাপ পেরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এ ফাইল পাঠানো হবে। এ প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারছে না।

সূত্রঃ জনকন্ঠ

Aviation News