বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে নিরাপত্তাঝুঁকি

এই লেখাটি 803 বার পঠিত

gh_lgবাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে লাগেজসহ পণ্য ওঠানামার কাজ অর্থাৎ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে অব্যবস্থাপনা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এতে করে বিঘিœত হচ্ছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, ব্যাহত হচ্ছে ফ্লাইটের সূচি, জট লাগছে যাত্রী ও লাগেজের এবং প্রশ্ন উঠছে সেবার মান নিয়ে। এমনকি যথাযথ হ্যান্ডলিং না হওয়ায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উড়োজাহাজের দরজা, ফিউজলেজসহ বডি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে করে বাইরের বিমান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো আমাদের ৩টি আন্তর্জাতিক বন্দরের ব্যবস্থাপনার মান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছে।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে এসব তথ্য তুলে ধরেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (বেবিচক)। এ জন্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধান্তসংবলিত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে বেবিচকের পক্ষ থেকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের মাধ্যমে তা গেজেট আকারে প্রকাশের ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে চিঠিতে।

বেবিচক প্রণীত নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে দায়িত্বপালনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তাদের একক কর্তৃত্ব হারাতে পারে। এ ছাড়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মতো জরুরি ও স্পর্শকাতর কাজে নিয়োজিতরা যাচ্ছেতাই কারণে যেন আন্দোলন-ধর্মঘট ডেকে বিমানবন্দর অচল করতে না পারে, নীতিমালায় সে জন্য সিবিএ বা ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ রাখা হয়নি।

জানা গেছে, একাধিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে ত্রুটির কারণে। এতে করে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ হচ্ছে, বিধায় বিষয়টি সরকারের উচ্চমহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে নানা সময় বিভিন্ন দেশের এয়ারক্র্যাফট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কয়েকটি নজিরও তুলে ধরেছে বেবিচক। বলা হয়েছে, গত ২৫ মে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্কিং বে-তে ওমান এয়ারলাইনসের একটি এয়ারক্র্যাফটকে আঘাত করে বিমানের একটি কার্গো কনটেইনার। এতে উড়োজাহাজটির ফিউজলেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগে গত ১৪ মে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ত্রুটির কারণে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ এয়ারক্র্যাফটের একটি দরজা বিমান থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ে। ওই দরজা প্রতিস্থাপনে কয়েক দিন সময় লাগায় উড়োজাহাজটি ততদিন অকেজো অবস্থায় ছিল। গত ২৫ এপ্রিল বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্টের কারণে শাহজালাল বিমানবন্দরের ৮ নম্বর বোর্ডিং ব্রিজে পার্করত অবস্থায় চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসের একটি এয়ারক্র্যাফটকে আঘাত করলে বিমানটির বডি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৫ দিন সময় ব্যয় হয় এয়ারক্র্যাফটটির মেরামতে।

বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গণি চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিনের পুরনো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি, জনবল স্বল্পতা ও ব্যবস্থাপনার সংকটে সার্ভিস দিতে বাংলাদেশ বিমান ব্যর্থ। এ সংস্থাটিই ঢাকার হযরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করে আসছে।
সূত্র জানায়, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় স্রেফ একটি চিঠির মাধ্যমে। দায়িত্বশীল সংস্থা হিসেবে বেবিচক এ চিঠি দিয়ে থাকে বাংলাদেশ বিমানকে এক বছর মেয়াদে। মেয়াদ শেষে আবারও চিঠির মাধ্যমে মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর ধরে। সম্প্রতি মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আবারও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে অনুমতি পেতে বেবিচকের কাছে আবেদন করেছে বাংলাদেশ বিমান। তবে এবার এ পর্যন্ত অনুমোদন মেলেনি। এক্ষেত্রে বেবিচক বলছে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সার্ভিস প্রদানে সরকারি নীতিমালা না থাকায় বিমানকে নতুন করে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এখন নীতিমালার খসড়া তৈরি। এটি চূড়ান্ত হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বেবিচকের চিঠিতে এ বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে এবার দেশের বাইরের অভিজ্ঞ কোনো কোম্পানিকে সঙ্গে নিয়ে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করার পরিকল্পনা করেছে বিমান। এ জন্য গত ১৯ মে দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ন্যূনতম দুবছর কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে এমন প্রতিষ্ঠানের কাছে দরপত্র চাওয়া হয়েছে। জানা গেছে, তাদের এ আহ্বানে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। বর্তমানে চলছে দরপত্রগুলোর মূল্যায়ন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন দেশের চারটি সংস্থার প্রায় ৫০টি ফ্লাইট ছাড়াও ১৮ দেশের ২৫টি সংস্থার প্রায় ১০০ উড়োজাহাজ ওঠানামা করে। ৩টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিচালিত দেশ-বিদেশের প্রায় ৪০টি যাত্রীবাহী ও বিমান সংস্থার ১৬০টি এয়ারক্র্যাফটকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিচ্ছে বাংলাদেশ বিমান। অবশ্য এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিমানের অনিয়ম-অদক্ষতার দুর্নামও রয়েছে, যা ঘোচানো সম্ভব হয়নি। গত পাঁচ বছরে এ খাতের জন্য বাংলাদেশ বিমান ৪৪৩ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কিনেছে। তারপরও নিখুঁত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে যাত্রীদের লাগেজ পেতে বিড়ম্বনাসহ উড়োজাহাজে মালামাল ওঠানামা, জ্বালানি ভরা, পরিচ্ছন্নতা, উড়োজাহাজ অবতরণের পর বিদ্যুৎ সরবরাহসহ অন্যান্য কাজে এসব বন্দরে অবতরণ করা সব বিমান সংস্থাকেই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিমানের অভ্যন্তরীণ এক তদন্তে এ খাতে বড় ধরনের দুর্নীতির প্রমাণও মিলেছে। অথচ শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিমানের আয়ের একটি বড় উৎস। এ উৎস থেকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা আয় হয়। কিন্তু সেবার বদলে মিলছে দুর্ভোগ আর দুর্নাম।

বেবিচক বলছে, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অরগানাইজেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) নিয়মানুযায়ী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সংস্থার লাইসেন্স প্রদান ও সেফটি ওভারসাইট কার্যক্রম পরিচালনার ভার বেবিচকের ওপর।
মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বেবিচকের প্রস্তাবিত নীতিমালায় লাইসেন্স প্রদানে ৩টি ক্যাটাগরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যাটাগরির ভিত্তিতে ফিও নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনটি ক্যাটাগরির মধ্যে ক্লাস ‘এ’ হচ্ছে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সার্ভিস প্রদানের যোগ্যতা। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে কাজের সুযোগ। ‘সি’ ক্যাটাগরির লাইসেন্স পাবে কোনো দেশি নিজস্ব এয়ারলাইনসের কাজের সুযোগ। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সার্ভিস প্রভাইডার (জিএইচএসপি) হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত পূরণসাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করতে চাইলে দেশি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা থাকতে হবে কমপক্ষে ৫১ শতাংশ। ‘এ’ ক্যাটাগরির লাইসেন্স হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে ইস্যু ফি ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া নবায়ন ফি রাখা হয়েছে ৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি রয়ালিটি ফি হিসেবে প্রতি মাসের আয়ের ২৫ শতাংশ পাবে বেবিচক।

সূত্রঃ আমাদের সময়

Aviation News