স্কাইট্র্যাক্স রেটিং : সেবামানে নিম্ন অবস্থানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স

এই লেখাটি 242 বার পঠিত
biman

স্কাইট্র্যাক্স রেটিং : সেবামানে নিম্ন অবস্থানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ইয়াঙ্গুন থেকে ঢাকা হয়ে কাঠমান্ডু ভ্রমণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ডি লিসন। তবে ভ্রমণটা তার জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। এ নিয়ে এয়ারলাইনস সেবার আন্তর্জাতিক মান সংস্থা স্কাইট্র্যাক্সে রীতিমতো ক্ষোভ ঝেড়েছেন মার্কিন এ নাগরিক। তিনি লেখেন, ‘এটি আমার জীবনে ভ্রমণ করা সবচেয়ে খারাপ এয়ারলাইনস। ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টরা ভালোমতো ইংরেজি বলতে পারেন না, সরবরাহ করা খাবারের মানও বাজে।’ রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইনসটি বন্ধ করে দেয়া অথবা ব্যক্তিখাতে দেয়ার পরামর্শও দেন এ যাত্রী।
একইভাবে বিমানের সেবা নিয়ে স্কাইট্র্যাক্সে অসন্তোষ প্রকাশ করেন কানাডার নাগরিক শাম্মি খানও। গত বছরের ৯ নভেম্বর তিনি বিমানের ফ্লাইটে লন্ডন থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসেন। ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় তিনি লেখেন, ‘বিমানের কেবিন ক্রুদের সেবাবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পরিবেশন করা খাবারের মান খারাপ, ইনফ্লাইট বিনোদনের ব্যবস্থাও যুগোপযোগী নয়। আর ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য হিথ্রো বিমানবন্দরে কোনো তথ্য সহযোগিতা ছিল না, যা খুবই দুঃখজনক।’
বাংলাদেশের পতাকাবাহী একমাত্র উড়োজাহাজ সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ভ্রমণের পর অসংখ্য যাত্রী এভাবে সেবার মান নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন স্কাইট্র্যাক্সে। আর যাত্রীদের এসব মতামতের ওপর ভিত্তি করে বিমানকে দুই তারকা এয়ারলাইনস সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্কাইট্র্যাক্স, যা মান সংস্থাটির বিবেচনায় পুওর বা নিম্নমানের। সাত বছর ধরে এ মান নিয়েই রয়েছে বিমান।
১৯৮৯ সাল থেকে বৈশ্বিক এয়ারলাইনস সেবা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মান সংস্থা স্কাইট্র্যাক্স। ১৬০টি দেশের প্রায় ২৫০টি এয়ারলাইনসের দুই কোটির বেশি যাত্রীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় স্কাইট্র্যাক্সের রেটিং। এতে এয়ারলাইনসের গ্রাহকসেবা, উড়োজাহাজ, কর্মী দক্ষতা, যাত্রা অবস্থায় ও যাত্রাবিরতিতে সেবাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়।
স্কাইট্র্যাক্সের রেটিংয়ে তথ্য সরবরাহ, ওয়েবসাইট ও গ্রাহকসেবার মান এবং ফ্লাইট ছেড়ে যাওয়া ও যাত্রাবিরতি বিবেচনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সেবাকে নিম্নমানের দেখানো হয়েছে।
স্কাইট্র্যাক্সে বিমানের যাত্রীদের বিভিন্ন অভিযোগ থেকে জানা যায়, বিমানের ইকোনমি ও বিজনেস শ্রেণীর সুযোগ-সুবিধার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। রেটিং তথ্য অনুযায়ীও এ দুই শ্রেণীর সেবার মান নিম্ন। বেশির ভাগ গ্রাহকই সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনা করতে না পারায় এয়ারলাইনসটির সমালোচনা করেছেন। উড়োজাহাজের ভেতরের নোংরা পরিবেশ, ফ্লাইট বিলম্ব হলে বিমানের কর্মীদের খুঁজে না পাওয়ার অভিযোগ তো রয়েছেই। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটগুলোয় ভ্রমণের সময় যাত্রীদের বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকাসহ আরো অনেক অভিযোগ রয়েছে। কিছু যাত্রী অভিযোগ করেছেন, খাবারের মান ভালো না হলেও বিমান থেকে যা খেতে দেয়া হবে তা-ই খেতে হবে। এক্ষেত্রে অন্য খাবার বাছাইয়ের সুযোগ নেই।
গ্রাহকসেবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকার কথা স্বীকার করেছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএম মোসাদ্দিক আহমেদ। তিনি বলেন, সেবার মান ঠিক রাখা প্রত্যেকটি এয়ারলাইনসের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিমানের যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে অনলাইন টিকেটিং, ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লায়ার, ইনফ্লাইট সেবার মানোন্নয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিমানের বহরেও গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হয়েছে, রয়েছে ড্রিমলাইনারের মতো আধুনিক সুবিধাসংবলিত উড়োজাহাজও।
তিনি বলেন, বিমানের কেবিন ক্রু, ফ্লাইট অ্যাসিস্ট্যান্টদের প্রশিক্ষণের জন্য নিজস্ব ট্রেনিং একাডেমি রয়েছে। কোনো কেবিন ক্রুর বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাকে পুনরায় প্রশিক্ষণের জন্য ট্রেনিং একাডেমিতে নেয়া হয়।
‘আকাশে শান্তির নীড়’ স্লোগান নিয়ে ১৯৭২ সালে যাত্রা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। শুরুর পর ১৮ বছর টানা লোকসান দেয় বিমান। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো মুনাফার মুখ দেখে সংস্থাটি। এরপর টানা পাঁচ বছর মুনাফা করতে সমর্থ হয়েছিল বিমান। তবে লাভের এ ধারা বেশিদিন অব্যাহত রাখতে পারেনি সংস্থাটি। পরবর্তী সময়ে অব্যাহত লোকসান থেকে বেরিয়ে আসতে ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়।
বর্তমানে বিমানের বহরে উড়োজাহাজ রয়েছে ১৩টি। এর মধ্যে চারটি বোয়িং-৭৭৭-৩০০ ইআর ও দুটি বোয়িং-৭৮৭ ‘ড্রিমলাইনার’। এছাড়া রয়েছে চারটি বোয়িং-৭৩৭-৮০০ ও তিনটি ড্যাশ-৮কিউ৪০০ উড়োজাহাজ। বহরের এ ১৩টি উড়োজাহাজের মধ্যে পাঁচটি আনা হয়েছে লিজ চুক্তির আওতায়। এর মধ্যে দুটি বোয়িং-৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ লিজ নেয়া হয়েছে জিই ক্যাপিটাল এভিয়েশন সার্ভিসেস থেকে। তিনটি ড্যাশ-৮কিউ৪০০ উড়োজাহাজের মধ্যে দুটি স্মার্ট এভিয়েশন এবং একটি নরডিক এভিয়েশন ক্যাপিটালের (এনএসি) দীর্ঘমেয়াদি ড্রাই লিজ চুক্তির আওতায় বিমানের বহরে যুক্ত রয়েছে। এছাড়া জিটুজি পর্যায়ে কানাডা থেকে তিনটি ড্যাশ-৮কিউ৪০০ উড়োজাহাজ সংগ্রহের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১ আগস্ট একটি চুক্তি হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রথম উড়োজাহাজটি ২০২০ সালের মার্চ, দ্বিতীয়টি একই বছরের মে ও তৃতীয়টি জুন নাগাদ বহরে যুক্ত হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে লাভজনক করার লক্ষ্যে নতুন নতুন গন্তব্য চিহ্নিতকরণ এবং বর্তমান লাভজনক রুটে ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন গন্তব্য হিসেবে গুয়াংঝু, মদিনা, কলম্বো, মালে রুটে ফ্লাইট চালু করা হবে।

Aviation News