শাহ আমানত বিমানবন্দরে ঝুঁকিপূর্ণ পাখির খামার

এই লেখাটি 204 বার পঠিত
bird

শাহ আমানত বিমানবন্দরে ঝুঁকিপূর্ণ পাখির খামার।

দেশের বিমানবন্দরগুলোয় ‘বার্ড হিট’ বা পাখির আঘাতে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এরপরও রহস্যজনক কারণে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রকাশ্যে পাখির খামার গড়ে তোলা হয়েছে।

খোদ রাষ্ট্রীয় ক্যারিয়ার বাংলাদেশ বিমানের কয়েকজন কর্মচারী মিলে বিমানের নিজস্ব ভবন এয়ারপোর্ট কমপ্লেক্সে এই খামার গড়ে তোলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও পাইলটরা বলেছেন, এই পাখি প্রতিনিয়ত তাদের বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণে চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। তাদের বক্তব্য, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এভাবে পাখি পোষা খুবই ভয়ংকর কাজ।
আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) আইন অনুযায়ী এটি বড় ধরনের অপরাধ। তারা অবিলম্বে বিমানবন্দরকে ঝুঁকিমুক্ত করতে এই পাখি পোষা বন্ধের কথা বলেন। অন্যথায় ছোট একটি পাখির কারণেও যে কোনো সময় হাজার কোটি টাকা দামের এয়ারক্রাফট দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে।
বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, বিমানবন্দরগুলোয় যাতে পাখি আসতে না পারে, সেজন্য সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এজন্য অনেক টাকা খরচ করা হচ্ছে। শাহ আমানত একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এ বিমানবন্দরে এরকম পাখির খামার থাকলে অবশ্যই তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্মূল করা হবে। একই সঙ্গে যারা এই খামার তৈরি ও পাখি পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় বিমানবন্দর সুষ্ঠু পরিচালনায় আকাশ পাখিমুক্ত রাখতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে উন্নতমানের ফাঁদ ও লেজারের সাহায্যে বিমানবন্দর পাখিমুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
শুধু একটি পাখি যে কোনো উড়োজাহাজের সর্বনাশ ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট। আমাদের দেশের বিমানবন্দরগুলো পাখিমুক্ত রাখতে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বার্ড শুটার নিয়োগের মাধ্যমে এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
ফেব্রুয়ারির ২য় সপ্তাহে পার্শ্ববর্তী দেশের একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বার্ডহিটে বিধ্বস্ত হয়। খোদ চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বার্ডহিটে ইঞ্জিন বিকল হয়ে উড়োজাহাজের জরুরি অবতরণের রেকর্ড রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবস্থিত বিমান নিজস্ব ভবন ‘এয়ারপোর্ট কমপ্লেক্স’ যে খামারটি রয়েছে, তা পরিচালনা করছেন এমটি (মোটর ট্রান্সপোর্ট) শাখার একজন কর্মী।
তার সঙ্গে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী ও বখাটে যুবক যৌথভাবে ব্যবসা করছেন। বর্তমানে এই খামারে কবুতরসহ বিভিন্ন প্রজাতির শতাধিক পাখি আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এয়ারপোর্ট কমপ্লেক্সে কর্মরত এক বিমানকর্মী বলেন, আগে এখানে হাজার হাজার পাখি পোশা হতো। স্থানীয় বাসিন্দারা সার্বক্ষণিক এই পাখির জন্য এখানে আসা-যাওয়া করতেন। কবুতরের বাসাগুলো এয়ারপোর্ট কমপ্লেক্সের ছাদের নিচে ড্রিল করে অ্যাংগেলের সাহায্যে বসানো হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী কিছুদিন আগে বিমানবন্দর সফরে চট্টগ্রাম আসেন। এ কারণে তখন বেশকিছু পাখির বাসা খুলে অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়েছিল। অভিযোগ আছে, আবারও সে বাসাগুলো লাগানোর চেষ্টা করছে খামারি।
পাশাপাশি খামারের পাখি আনা-নেয়ার জন্য তিনি সার্বক্ষণিক বিমানের গাড়ি ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের এক প্রকৌশলী বলেন, এই খামারের পাশেই ১১ হাজার ভল্টেজের বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের একটি সাব-স্টেশন রয়েছে। তার পাশেই বিমান স্টাফ ক্যান্টিন এবং কেন্টিনের ওপরেই নির্মাণাধীন ক্যাটারিং সেন্টার রয়েছে।
এই খামারের পেছনে বিমানের প্রকৌশল শাখা এবং সঙ্গেই বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোন এলাকা। বর্তমানে প্রকৌশল শাখার সামনে ইয়ংওয়ানের ৩/৪টি প্রশিক্ষণ বিমান পার্কিং অবস্থায় থাকে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বর্তমানে দৈনিক শতাধিক বিমান অবতরণ ও উড্ডয়ন করে থাকে। তার মধ্যে সামরিক-বেসামরিক এবং প্রশিক্ষণ বিমানও রয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, এয়ারপোর্ট কমপ্লেক্সে কবুতর খামারের নিচে ও আশপাশে কবুতরের মল, খড় ও পালকের কারণে পুরো এলাকা হাঁটা-চলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
দুর্গন্ধযুক্ত ও অপরিচ্ছন্ন হওয়ায় ওখানে কেউ যেতে পারেন না। ওই এলাকায় কোনো গাড়ি পার্কিং করলেই কবুতরের মলে নোংরা হয়ে যায়। এই খামার দেখাশোনা করার জন্য পাশেই একটি ছোট ঘরের মতো বানিয়ে তার ভেতর একটি বেঞ্চ ও সিলিং ফ্যান ঝুলানো হয়েছে।
জানা গেছে, এই খামারের মালিক বিমান এমটি শাখার সুপারভাইজার শাহ আলমের চট্টগ্রামের বাড়িতেও পাখির খামার রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, বিমানে চাকরির পাশাপাশি কবুতর ও পাখি পালন করেন শাহ আলম। বিমান সূত্রে জানা গেছে, শাহ আলম বিমানের ভিআরএস (স্বেচ্ছায় অবসর) প্রকল্পের আওতায় স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণকারী একজন কর্মচারী। পরবর্তী সময়ে মামলার মাধ্যমে তিনি আবার বিমানে ফেরত আসেন।
নিয়ম অনুযায়ী সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস আদেশ না থাকলে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকতে পারেন না। কিন্তু শাহ আলমকে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও এয়ারপোর্টে এসে পাখির পরিচর্যা করতে দেখা যায়। তিনি কবুতরের খাঁচা পরিবহনে বিমানের গাড়িও ব্যবহার করেন। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সংরক্ষিত এলাকায় কবুতরের খামার পরিচালনা করা একটি ফৌজদারি অপরাধ।
এ প্রসঙ্গে বিমানের মোটর ট্রান্সপোর্ট শাখার প্রধান শাহ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শখের বশে তিনি পাখি পালন করতেন আগে। আস্তে আস্তে পাখি বেশি হয়ে গেছে। তবে তিনি বলেন, পাখিগুলো বিমানের জন্য কোনো ধরনের থ্রেট নয়। সার্বক্ষণিক পাখিগুলো তিনি খাঁচার মধ্যে আটকে রাখেন।
শাহজালালে বাড়ছে ‘বার্ড হিট’র ঝুঁকি : এদিকে শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বাড়ছে বার্ড হিটের ঝুঁকি। দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে পাখি তাড়ানোর যন্ত্র দুটি অকেজো থাকায় প্রতিদিনই এখানে পাখি বাড়ছে।
বিমানবন্দরের চারপাশের জলাশয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে অতিথি পাখি। বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় কম উচ্চতায় নেমে আসার কারণে বার্ড স্ট্রাইকের আশঙ্কা আছে। এ কারণে বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনারও ঝুঁকি রয়েছে। জানা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়ের চারপাশে রয়েছে কয়েকটি জলাশয়। এসব জলাশয়ের মাছ, কীটপতঙ্গ, জলজ উদ্ভিদ পাখিদের আকষর্ণীয় খাবার।
বিমানবন্দরের পশ্চিমে বাউনিয়া এলাকাটি মূলত গ্রামীণ পরিবেশ। রানওয়ের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে ঘাস ও ঝোপঝাড়। এছাড়া বিমানবন্দরের চারপাশে জনমানুষের সমাগম কম থাকায় এসব এলাকা পাখিদের অবাধ বিচরণ।
রানওয়ের চারপাশ থেকে পাখি সরানোর জন্য শাহজালাল বিমানবন্দরে রয়েছে বার্ড শুটার। তবে কম জনবল থাকায় এ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাখি সরাতে একসময় শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র থাকলেও বর্তমানে তা অকার্যকর। শুধু বার্ড শুটাররা বন্দুক দিয়ে পাখি তাড়ানোর কাজ করছেন, যদিও বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে লেজার লাইট, আলট্রা সাউন্ডের মাধ্যমে পাখি তাড়ানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা জানান, উড়ন্ত বিমানের ইঞ্জিনে পাখি প্রবেশ করলে বেশি ক্ষতি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। ইঞ্জিনের ফ্যান-ব্লেড ও স্পিনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ইঞ্জিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বার্ড হিটের ঝুঁকি থাকলে পাইলটদেরও মানসিক চাপে থাকতে হয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পাখি তাড়াতে বার্ড শুটারের বিকল্প নেই। সাউন্ড দিয়ে পাখি সরানোর যন্ত্র আমাদের ছিল, এগুলো এখন নেই। এসব যন্ত্রে খুব বেশি একটা কাজও হয় না। আমরা সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকি যেন কোনো ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি না হয়। চট্টগ্রামে পাখির খামারের বিষয়ে তিনি দেখবেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।

Aviation News