বিমানের ৪৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

এই লেখাটি 289 বার পঠিত
biman 222

গত ৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজ পরিচালনা সংস্থা ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’ এর ৪৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়েছে ।
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েকদিন পর ৪ জানুয়ারি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যাত্রা শুরু করে । শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল অ্যারো বাংলা ইন্টারন্যাশনাল। পরে স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নাম দেন ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই প্রখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসান বিমানের ‘বলাকা’ লোগো ডিজাইন করেন। যা বর্তমানে বিমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৯৭২ সালের এ দিনে বিমানের পথ চলার সূচনা। স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল তাদের একটি নিজস্ব এয়ারলাইন্স হবে। সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার  ১৯ দিনের মাথায় তাঁর চেতনাকে ধারণ করে জন্ম নেয় এ সংস্থা। তাই স্বাধীনতা,  বিমান ও বঙ্গবন্ধু একই সূত্রে গাঁথা।

১৯৭২ সালে বিমানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ডাকোটা উড়োজাহাজ দিয়ে আর সর্বশেষ গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর ও ৫ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে এর বহরে সংযুক্ত হয় বিশ্বের সর্বাধুনিক বোয়িং-৭৮৭ ড্রীমলাইনার। এখন বিমান বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫টি। ‘গাঙচিল’ ও ‘রাজহংস’ নামের আরও দুটি ড্রিমলাইন বহরে যুক্ত হবে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে।  ২০০৮ সালে বোয়িং ও বিমানের মাঝে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যে ১০টি নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ ক্রয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পর থেকে ড্রিমলাইনার সংযোজনের দিনটির জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে সবাই। ড্রীমলাইনারের রেঞ্জ, আসন সংখ্যা, সাশ্রয়ী পরিচালন ব্যয় ও যাত্রীদের দৃষ্টিকোন থেকে ভ্রমণের স্বাচ্ছন্দ্য বিবেচনায় এ এয়ারক্রাফট বিমান বহরে সংযোজনের ফলে বিমানের যাত্রী সেবায় একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় বিমানের অবস্থা ছিলো খুবই নাজুক। অতিশয় পুরানো বহর দিয়ে খুবই কায়ক্লেশে ‘দিনাতিপাত’ চলছিল বিমান।  বিপর্যস্ত শিডিউল, জরাজীর্ণ বিমান বহর, অন্তহীন অভিযোগে বিমান মুখ থুবড়ে পড়ে। এ সংকট উত্তরণে প্রয়োজনীয় কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়ন করে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হয়। সত্যিকার অর্থে সর্বাঙ্গসুন্দর একটি এয়ারলাইন্স হিসেবে বিমানকে গড়ে তোলার জন্য বিমান পরিচালনা পর্ষদকে নিদের্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তার পরের ইতিহাস সবার জানা। বিশ্বখ্যাত বোয়িং এর সাথে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে নতুন জাহাজ সংগ্রহের দিন-ক্ষন এগিয়ে আনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় একের পর এক বিমান বহরে সংযুক্ত হয়েছে  পালকি, অরুন আলো, আকাশপ্রদীপ, রাঙ্গাপ্রভাত, মেঘদূত ও ময়ূরপংখী। বিশালাকারের অত্যাধুনিক জাহাজগুলি আকাশের বিস্ময় এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। একই সাথে অভ্যন্তরীন গন্তব্য সমূহে বিমানের কানেকটিভিটি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার গত বছরের আগস্টে কানাডার সাথে ০৩ টি ড্যাশ-৮ বোম্বারডিয়ার উড়োজাহাজ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়াও ০১টি উধংয৮ ছ৪০০ ও ০২টি ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ লীজ গ্রহণের কার্যক্রম চুড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে চুক্তিবদ্ধ ০১টি উধংয৮ উড়োজাহাজ এবং ২টি লীজে সংগৃহীত বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ বিমান বহরে যোগদান করবে বলে বিমান সুত্রে জানা গেছে।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দিক আহমদ জানান, ২০১১ সালে বিমান বহরে প্রথম বোয়িং ৭৭৭-৩০০ঊজ উড়োজাহাজ যোগদানের পূর্বে বিমান বহরে মোট ০৮টি উড়োজাহাজের গড় বয়স ছিল ২০ বছরের বেশি। নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ বহওে যোগ দেয়ার পর থেকে অবস্থার ক্রমান্বয়ে উন্নতি হতে থাকে। বর্তমানে লীজে সংগৃহীত উড়োজাহাজের বয়স ৭ বছরেরও কম এবং বিমানের নিজস্ব ০৮টি উড়োজাহাজের গড় বয়স ৩.৭ বছর।
বিমানের ডিরেক্টর (মার্কেটিং এন্ড সেলস) আশরাফুল ইসলাম জানান, বহরের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিমানের বাণিজ্যিক পট পরিবর্তনও হয়েছে। উপর্যুপরী লোকসানের পর ২০১৪-১৫ অর্থ বছর থেকে বিমান পর পর ০৩ বছর মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়। নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ সংযোজনের পর থেকে ক্রমান্বয়ে বিমান যাত্রী সেবার মান উন্নত করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে প্রতিযোগিতাপূর্ণ এভিয়েশন বাণিজ্যে একটি যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিমানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরও জানান, সম্প্রসারিত এই বহর দিয়ে বিমানের চলমান রুটসমূহে ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন গন্তব্য হিসেবে গোয়াংজু, কলোম্বো এবং মালে-তে ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে।

বিমানের জিএম (পিআর) শাকিল মেরাজ জানান, বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশে একমাত্র গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্ট। বিমান নিজস্ব ফ্লাইট পরিচানার পাশাপাশি  বাংলাদেশ ফ্লাইট পরিচালনাকারী সকল বৈদেশিক বিমান সংস্থার ফ্লাইটসমূহের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা প্রদান করে থাকে। এই খাতটিতে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা আছে। তবে ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা চলছে। গত এক বছরে এই খাত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যশে ৬৯টি নতুন গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়াও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এর মান উন্নয়নে বিমানবন্দরে ৭ শতাধিক নতুন জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও বিমান গত ১০ বছরে ব্যবস্থাপনাকে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজিয়েছে # প্রায় ০৭ বছর স্থগিত থাকার পর ২০১৫ সালে বিমান অভ্যন্তরীন রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে # বিমানের টিকেট বিক্রয়ে পূর্ণ অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে#  নতুন নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেয়া  হয়েছে #  বিমানের ফ্লাইটসহ তথ্যসমূহ সম্মানিত যাত্রীদের অবগতির জন্য ০১ অক্টোবর, ২০১৫ থেকে এসএমএস সেবা চালু হয়েছে # ০৭ মে, ২০১৮ থেকে বিমানের কলসেন্টার চালু করা হয়েছে।  বিমানের জন্য ১০ বছরের একটি ফ্লিট প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে।  এ সব কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে বিমান হয়ে উঠবে আমাদের আস্থা ও গৌরবের প্রতীক।

বিমান ও পর্যটন সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, ‘সরকার জনকল্যাণে কাজ করে চলেছে নিরন্তর। প্রবাসে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১০ মিলিয়ন বাংলাদেশীর আশা আকাংখার প্রতি আমরা সম্মান জানাই। বিমান বহরে নতুন জাহাজ যুক্ত হওয়ার পর এখন আমি আশা রাখি নতুন নুতন গন্তব্যে উড়ে যাবে বিমান। বিমান ব্যবস্থাপনা সে লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে।’
বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামাল বিমানের ৪৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশবাসিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘জাতীয় পতাকাবাহি বিমান হবে যাত্রীদেও আগামী দিনের  আস্থা ও নিরাপত্তার প্রতীক’।

Aviation News