‘ফ্রি’-তে পাওয়া জুভেন্টাস ক্লাবের যত রত্ন!

এই লেখাটি 63 বার পঠিত
জুভেন্টাস

বছরের পর বছর প্রায় বিনা মূল্যে খেলোয়াড় নিয়ে এসে সফল হওয়াটাকে জুভেন্টাস যেন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সামনের বছরও আর্সেনাল থেকে ‘ফ্রি’তে ওয়েলশ মিডফিল্ডার অ্যারন র‍্যামসিকে নিয়ে আসছে তারা, দুদিন আগে আনুষ্ঠানিকভাবে র‍্যামসিকে দলে নেওয়ার কথা প্রকাশ করেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বর্তমান ক্লাব। তবে শুধু র‍্যামসিই নন, গত কয়েক বছর ধরে এমন অনেক খেলোয়াড়কেই বিনা মূল্যে দলে ভিড়িয়েছে তারা।
সেই ২০০৮ সাল থেকে আর্সেনালের ঘরের ছেলে হয়ে থাকা ওয়েলশ মিডফিল্ডার অ্যারন র‍্যামসির চুক্তি এই মৌসুমেই শেষ হয়ে যাবে। বর্তমান চুক্তি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো ধরনের ‘ট্রান্সফার ফি’ ছাড়াই দলবদল করতে পারবেন র‍্যামসি। আর এই সুযোগটাই লুফে নিয়েছে জুভেন্টাস। সামনের মৌসুম থেকে রোনালদো-দিবালাদের সতীর্থ হিসেবে দেখা যাবে র‍্যামসিকে।

আর্সেনালের সাবেক কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের পছন্দের এই মিডফিল্ডার আবার নতুন কোচ উনাই এমেরির অতটা প্রিয়পাত্র নন; তার ওপর এমেরি চান নতুন কিছু খেলোয়াড়, যারা এমেরির দর্শনকে ঠিকঠাক মাঠে প্রতিফলিত করতে পারবেন। নতুন চুক্তির জন্য র‍্যামসি আর্সেনালের কাছে যে বেতন বৃদ্ধির ফরমাশ করেছেন, সে বেতনে র‍্যামসিকে না রেখে নিজের পছন্দের কিছু খেলোয়াড় এনে দলকে সাজাতে এমেরি বেশি আগ্রহী। ফলে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়, যে ‘ফ্রি’তে আর্সেনাল ছাড়ছেন র‍্যামসি। র‍্যামসির মতো মানসম্পন্ন খেলোয়াড়কে ফ্রি-তে পাওয়ার লোভ কে-ই বা সংবরণ করতে পারে? ভাবা যায়! র‍্যামসিকে পাওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস, বায়ার্ন মিউনিখ, পিএসজি, এসি মিলান, চেলসি, লিভারপুলের মতো ক্লাবগুলো!
সবাইকে হারিয়ে শেষমেশ জুভেন্টাসই জিতে নিল র‍্যামসিকে। ‘ফ্রি’তে খেলোয়াড় দলে ভেড়ানোর ক্ষেত্রে যাদের ‘সুনাম’ আকাশচুম্বী। বর্তমান ক্লাবের সঙ্গে কোনো খেলোয়াড়ের চুক্তি যখনই শেষ হয়ে যায়, তখন অন্য ক্লাব চাইলে সেই খেলোয়াড়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আগের ক্লাবকে কোনো ধরনের মূল্য না দিয়েই খেলোয়াড়কে নিজের দলে আনতে পারে। আর এভাবে ক্লাবকে খেলোয়াড়ের দাম না দিয়ে, চুক্তি শেষ হওয়া অনেক খেলোয়াড়কেই ‘ফ্রি’ তে নিজেদের দলে নিয়ে এসেছে জুভেন্টাস, গত কয়েক বছরে। কারা তারা? আসুন দেখে নেওয়া যাক।

২০১৯-২০ মৌসুম
সামনের মৌসুমের ‘ফ্রি’ খেলোয়াড় হিসেবে আর্সেনাল থেকে জুভে আসছেন অ্যারন র‍্যামসি, ওপরেই উল্লেখ করা হলো সেটা। বিভিন্ন বোনাস সহ র‍্যামসিকে বছরে ৬ মিলিয়ন পাউন্ডের মতো বেতন দেবে জুভেন্টাস। আর্সেনাল এক কানা-কড়িও পাবে না, কেননা আর্সেনালের হয়ে পুরো চুক্তি শেষ করে জুভে যাচ্ছেন এই ওয়েলশ মিডফিল্ডার।

২০১৮-১৯ মৌসুম
চলমান মৌসুমের শুরুতে ‘ফ্রি’তে লিভারপুল থেকে জার্মান মিডফিল্ডার এমরে চ্যান কে নিয়ে এসেছে জুভেন্টাস। জুভেন্টাসে এখন প্রতি মৌসুমে ৪ মিলিয়ন পাউন্ড করে কামাচ্ছেন তিনি। চ্যান ছাড়াও এই মৌসুমে ‘ফ্রি’তে জুভেন্টাসে এসেছেন ইতালিয়ান রাইটব্যাক লরেঞ্জো দেল প্রেতে, পেরুজিয়া থেকে, জুভেন্টাসের অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে খেলবেন তিনি।

২০১৭-১৮ মৌসুম
এই মৌসুমে তেমন কোনো নামকরা তারকাকে ফ্রি তে আনেনি জুভেন্টাস। তবে নিজেদের অনূর্ধ্ব-২৩ দলের জন্য ডাচ মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো ফার্নান্দেসকে পিএসভি আইন্দহোভেন থেকে ফ্রি তে এনেছিল তারা।

২০১৬-১৭ মৌসুম
এই মৌসুমে বার্সেলোনা থেকে ব্রাজিলিয়ান রাইটব্যাক দানি আলভেসকে ফ্রি তে এনেছিল জুভেন্টাস। এক বছরে জুভেন্টাসে থেকে একটা লিগ ও একবার কোপা ইতালিয়া জিতেছেন তিনি। কোমো থেকে ইতালির তরুণ স্ট্রাইকার সিমোনে আন্দ্রেয়া গাঞ্জও ‘ফ্রি’তে এই মৌসুমেই এসেছিলেন।

২০১৫-১৬ মৌসুম
এই মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ফ্রি তে জার্মান মিডফিল্ডার সামি খেদিরাকে নিয়ে এসেছিল জুভেন্টাস। জুভেন্টাসের হয়ে এর মধ্যেই তিনবার লিগ, তিনবার কোপা ইতালিয়া ও একবার সুপারকোপা জেতা হয়ে গেছে তার। কিংবদন্তি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনের সঙ্গে অদলবদল করে খেলানোর জন্য ফিওরেন্টিনা থেকে ব্রাজিলের গোলরক্ষক নেতো কেও এই মৌসুমেই ফ্রি তে আনে জুভেন্টাস। পারমা থেকে তরুণ ইতালিয়ান স্ট্রাইকার আলবার্তো চেরিও বিনা মূল্যে চলে আসেন।

২০১৪-১৫ মৌসুম
পিএসজি থেকে ফরাসি উইঙ্গার কিংসলে কোমান ও সিয়েনা থেকে ইতালিয়ান স্ট্রাইকার লরেঞ্জো রসেত্তি এই মৌসুমে ফ্রি তে আসেন জুভেন্টাসে।

২০১৩-১৪ মৌসুম
এ মৌসুমে অ্যাথলেটিক বিলবাও থেকে স্প্যানিশ স্ট্রাইকার ফার্নান্দো ইয়োরেন্তেকে ফ্রি তে আনে জুভেন্টাস।

২০১২-১৩ মৌসুম
এই মৌসুমে মোট তিনজন খেলোয়াড় ফ্রি তে যোগ দেয় জুভেন্টাসে। ইন্টার মিলান থেকে কিংবদন্তি ব্রাজিলের সেন্টারব্যাক লুসিও, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের তরুণ ফরাসি মিডফিল্ডার পল পগবা ও পালেরমোর ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক রুবিনহো। পগবাকে পরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছেই বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হিসেবে বিক্রি করে জুভরা, ৮৯.৬ মিলিয়ন পাউন্ডে। মানে, পগবাকে দিয়েই পুরো ৮৯.৬ মিলিয়ন পাউন্ডই লাভ করে জুভেন্টাস!

২০১১-১২ মৌসুম
মোট তিনজন খেলোয়াড় ফ্রি তে এই মৌসুমে জুভেন্টাসে যোগ দেন – ইতালির কিংবদন্তি মিডফিল্ডার আন্দ্রেয়া পিরলো (এসি মিলান থেকে), সুইস রাইটব্যাক রেতো জিয়েগলার (সাম্পদোরিয়া থেকে), ইতালির সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার মিশেল পাজিয়েনজা (নাপোলি থেকে)। শুধু জুভেন্টাস বলে নয়, ফুটবল ইতিহাসের সেরা ‘ফ্রি ট্রান্সফার’ বলা হয় পিরলোর দলবদলটাকে। ২০০২-০৩ মৌসুমের পর থেকে একটা লিগ শিরোপার জন্য হাপিত্যেশ করতে থাকা জুভেন্টাসকে সে মৌসুমে লিগ শিরোপা এনে দেওয়ার পেছনে পিরলোর অবদান সর্বাধিক। রেতো জিয়েগলারের কপাল আবার অত ভালো ছিল না। জিয়েগলার যোগ দেওয়ার পরেই জুভেন্টাসের কোচ পরিবর্তন হয়, দলে আসেন আন্তোনিও কন্তে। কন্তে জিয়েগলারকে দলে চাননি, ফলে তাড়াতাড়ি তুর্কি ক্লাব ফেনেরবাচেতে ধারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

২০১০-১১ মৌসুম
জেনোয়া থেকে ফ্রি তে এই মৌসুমে জুভেন্টাসে যোগ দেন ইতালি স্ট্রাইকার লুকা টনি।

২০০৯-১০ মৌসুম
এই মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে নিজেদের সাবেক তারকা ডিফেন্ডার ফাবিও ক্যানাভারোকে ‘ফ্রি’ হিসেবে আনে জুভেন্টাস।

২০০৮-০৯ মৌসুম
বার্সেলোনা থেকে স্প্যানিশ উইঙ্গার ইয়াগো ফালকে ও অ্যাস্টন ভিলার পোড় খাওয়া সুইডিশ সেন্টারব্যাক ওলোফ মেলবোর্গ এই মৌসুমেই চলে আসেন জুভেন্টাসে, ‘ফ্রি’ তে।

২০০৭-০৮ মৌসুম
বায়ার্ন মিউনিখের বসনিয়ান মিডফিল্ডার হাসান সালিহামিদজিচ আয়াক্সের চেক ফুলব্যাক জেদেনেক গ্রিগেরা কে এই মৌসুমে ফ্রি তে আনে জুভরা।

এ তো গেল গত কয়েক বছরে শুধু ‘ফ্রি’ তে আনা খেলোয়াড়দের তালিকা। ‘ফ্রি’ ছাড়াও, একদম নামমাত্র মূল্যে অন্য দলের অপ্রয়োজনীয় খেলোয়াড়কে নিজেদের দলে নিয়ে এসে ট্রফি জেতার একাধিক নজির গড়েছে, গড়ছে জুভেন্টাস। মাত্র এক মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ২০১৪ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে কার্যকরী ফরাসি লেফটব্যাক প্যাট্রিস এভরাকে নিয়ে এসে তিনবার লিগ জিতেছিল জুভেন্টাস। কার্লোস তেভেজ এর মতো স্ট্রাইকারকে মাত্র ১৩ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাব থেকে এনে দলের মূল স্ট্রাইকার করেছিল জুভেন্টাস, সেই ২০১৩ সালে। মাত্র ৯ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে দলে আসা ঘানার লেফটব্যাক কাওয়াদো আসামোয়াহ সাত বছর ধরে জুভেন্টাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে এই মৌসুমেই পাড়ি জমিয়েছেন ইন্টারে। মাত্র ০.৩ ইউরোতে ভলফসবুর্গ থেকে ইতালির সেন্টারব্যাক আন্দ্রেয়া বারজাগলি জুভেন্টাসে এসে জর্জো কিয়েল্লিনি ও লিওনার্দো বোনুচ্চির সঙ্গে মিলে গঠন করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম ভীতিজাগানিয়া রক্ষণভাগ।

Aviation News